Home » Top 10 » গবেষণাপত্রে শিক্ষকদের চৌর্যবৃত্তি নিয়ে করণীয় কী?

গবেষণাপত্রে শিক্ষকদের চৌর্যবৃত্তি নিয়ে করণীয় কী?

গবেষণা পত্রে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। তবে এই ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন মনে করে এ ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানো ছাড়া উপায়্ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ যে পাঁচজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে, তারা হলেন, সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিয়া রহমান, ক্রিমিনোলজি বিভাগের শিক্ষক মাহফুজুল হক মারজান এবং ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক রুহুল আমিন, নুসরাত জাহান ও বদরুজ্জামান ভূঁইয়া।

সামিয়া রহমান একই সঙ্গে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান হিসেবেও কাজ করেন। সামিয়া রহমান ও মাহফুজুল হক মারজানের একটি যৌথ লেখা গত বছরের ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ‘সায়েন্স রিভিউ’ নামে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ‘এ নিউ ডাইমেনশন অফ কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার: এ কেস স্ট্যাডি অফ দ্য কালচারাল ইমপেরিয়ালিজম’। অভিযোগ, তারা মিশেল ফুকো’র ‘দ্য সাবজেক্ট অ্যান্ড পাওয়ার’ নামের একটি আর্টিকেল থেকে হুবহু কপি করেছেন কোনো স্বীকৃতি ছাড়াই। ১৯৮২ সালের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল ‘ক্রিটিক্যাল ইনকোয়ারি’র ৪ নম্বর ভলিউমের ১৯ নং পৃষ্ঠায় ফুকোর এই আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে তাদের দু’জনের গবেষণাপত্রের ৬১ ভাগই নকল।

অন্যদিকে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তিন শিক্ষক একইভাবে অন্যের লেখা তাদের গবেষণাপত্রে নিজেদের লেখা বলে চালিয়ে দিয়েছেন।

সামিয়া রহমান ডয়চে ভেলের কাছে দাবি করেছেন, আমি ওই আর্টিকেল লিখিনি। মারজান (মাহফুজুল হক মারজান)-এর সঙ্গে আমি একটা লেখার আইডিয়া শেয়ার করেছিলাম। পরে সে আমার সঙ্গে আর কথা না বলেই সেই লেখা আমার ও তার নামে জার্নালে ছাপিয়েছে। এখন তদন্ত হচ্ছে। তদন্তের পর আমি বিস্তারিত বলব। আমি এই ঘটনায় কোনোভাবেই জড়িত না।

অন্যদিকে মাহফুজুল হক মারজান বলেন, আমরা দু’জন মিলেই আর্টিকেলটি লিখেছি। সামিয়া রহমানের অ্যাকটিভ অংশগ্রহণ ছিল। আর আমাদের অপরাধ কী হয়েছে তা তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ হলেই জানা যাবে। আমি কমিটির কাছে আমার বক্তব্য দিয়েছি। এখন আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এর আগেও কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। তবে সবাই শাস্তির আওতায় আসেননি। গবেষণাপত্রে চৌর্যবৃত্তির দায়ে ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আ জ ম কুতুবুল ইসলাম নোমানীকে পদাবনতি দিয়ে সহকারি অধ্যাপক করা হয়।

পিএইচডি থিসিসে জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নূর উদ্দিন আলোকে চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

গবেষণা জালিয়াতি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের আরেকজন শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবু বকর সিদ্দিক-এর বিরুদ্ধে সংখ্যাতিরিক্ত শিক্ষক হওয়ার অভিযোগ আছে।

এছাড়া সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সালমা বেগমের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ ওঠে এক বছর আগে।

বর্তমানে যে পাঁচ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে, সেই তদন্ত কমিটির একজন সদস্য হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ কে এম মাকসুদ কামাল। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ওই পাঁচজনের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আগেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ পাওয়ার ভিত্তিতে আমরা ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এখন পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে একটি নীতিমালা করা প্রয়োজন। আর তাতে এই ধরণের কোনো অপরাধে কী শাস্তি হবে তা সুনির্দষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। কারণ, অতীতে দেখা গেছে, একই অপরাধে ভিন্ন শাস্তি হয়েছে।
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, আমাদের কাছে ঠিক হিসাব নাই যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতজন শিক্ষক এ পর্যন্ত এই ধরনের চৗর্যবৃত্তির সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। আমাদের একটি স্ট্যান্ডিং কমিটি আছে। কমিটির কাছে অভিযোগ দেয়া যায়। অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেই।

শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একই অবস্থা বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এমনকি ইউজিসির অর্থায়নে নানা গবেষণা এবং জার্নালেও চৌর্যবৃত্তির ঘটনা ধরা পড়েছে।
 
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান ডয়চে ভেলেকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা এখন সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ঘটছে। আমাদের এ ব্যাপরে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো এখতিয়ার নাই। তবে আমাদের অর্থায়নে যেসব গবেষণা হয়, জার্নাল প্রকাশ হয়, সেখানে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। আমরা অনেক চৌর্যবৃত্তির ঘটনা ধরেছি এবং লেখা প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। কিন্তু কিছু ব্যবস্থা নেয়া হলেও সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের কলুষমুক্ত রাখার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মর্যাদার প্রশ্ন। এসব ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া ঠিক না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। -ডয়চে ভেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *