শিরোনাম
Home » Top 10 » চট্টগ্রাম বন্দরে মামলার ফাঁদে আটকা সাত বিদেশি জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দরে মামলার ফাঁদে আটকা সাত বিদেশি জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দরে মামলার ফাঁদে আটকা পড়েছে সাত বিদেশি জাহাজ। মিডল্যান্ড ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের মামলায় এসব জাহাজ আটকাদেশ দেয় এডমিরালটি আদালত। আদালতের আটকাদেশের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে রয়েছে আরো ৭ বিদেশি জাহাজ। চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা পরিষদের সদস্য (প্রশাসন ও গণসংযোগ) মো. জাফর আলম চৌধুরী বিদেশি জাহাজ আটকা পড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, শিপিং বাণিজ্যের ইতিহাসে একসঙ্গে এতগুলো জাহাজ আটকে পড়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এতে বিদেশি জাহাজ মালিকদের মধ্যে আতংক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। দেশের আমদানি-রপ্তানিতেও বিপর্যয়ের আশংকা দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, আদালত থেকে জাহাজ আটকাদেশের পর তা ন্যস্ত হয় বন্দরের হেফাজতে। আদালতের পুনরাদেশ ছাড়া জাহাজ যাতে বাংলাদেশের জলসীমা ত্যাগ করতে না পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে। জাহাজের ছাড়পত্র প্রদান (এনওসি) বন্ধ রাখে বন্দর কর্তৃপক্ষ। 
বন্দর সূত্র জানায়, মিডল্যান্ড ব্যাংকের মামলার প্রেক্ষিতে ১৪টি বিদেশি জাহাজের বিরুদ্ধে আটকাদেশ জারি হয়েছে এডমিরালটি আদালত থেকে। মামলা হয়েছে এসব জাহাজের মালিক এবং মাস্টারসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। গত ১১ই জানুয়ারি এই আটকাদেশ দেয়া হয়। 
জাহাজগুলোর মধ্যে মাল্টা পতাকাবাহী কালামাতা ট্রেডার, সাইপ্রাস পতাকাবাহী ক্যাপে সাইরস, মাল্টা পতাকাবাহী টিজিনি, কামিল্লা, মাল্টা পতাকাবাহী সি মাস্টার, সিঙ্গাপুর পতাকাবাহী ম্যাজেস্টিক এবং ওইএল লংকা চট্টগ্রাম বন্দরে থাকায় আটকাদেশ কার্যকর হয়েছে। 
এছাড়া ওইএল মালয়েশিয়া চট্টগ্রামের পথে রয়েছে। অন্য ৬টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে রয়েছে। জাহাজ হলো-এন্ডারসন ব্রিজ, মেরাটাস মেডান, আরকা, হানসা কাসেলা, এমসিসি জাভা এবং ম্যাক্স সাটল।
সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে মেসার্স গ্লোবাল এগ্রো রিসোর্সেস কর্তৃক রপ্তানি করা আলু নিয়ে গিয়েছিল জাহাজগুলো। আমদানিকারক ছিল ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস মালয়েশিয়া। এসব আলুর রপ্তানি মূল্য বাবদ ১৩ লাখ ৪৯ হাজার ২১৬ ডলার পাওনার দাবিতে মিডল্যান্ড ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসুদুজ্জামান মামলা দায়ের করেন এডমিরালটি আদালতে। 
মামলায় জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে আটকাদেশের আবেদন জানানো হয়। এডমিরালটি আদালত তা মঞ্জুর করে আটকাদেশ দেন। যে ৭টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ছিল সেগুলো তাতে আটকে গেছে। এর মধ্যে কয়েকটি জাহাজের এজেন্ট এবং লাইনও পরিবর্তন হয়েছে। 
সি মাস্টার ২০১৬ সালে যখন রপ্তানি পণ্য নিয়ে গিয়েছিল তখন এটা ছিল ওইএলএর। আর স্থানীয় এজেন্ট ছিল জিবিএক্স। বর্তমানে এটা সীমাটেক লাইনের অধীনে পরিচালিত হয়। আর স্থানীয় এজেন্ট হচ্ছে সিএনসিএল। আমদানি পণ্যবোঝাই কন্টেইনার খালাসের পর জাহাজটি নির্ধারিত রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার নিতে পারেনি, আটকে গেছে। 
ম্যাজেস্টিক জাহাজটি আমদানি কন্টেইনার নামিয়ে বোঝাই করেছে রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার। জাহাজটি আটকে পড়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পণ্যের আমদানিকারক জার্মান প্রতিষ্ঠান সিএসএ।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক, চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহসভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একই সময়ে এত সংখ্যক ফিডার জাহাজ আটকে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বে তৈরি পোশাক শিল্প। যথাসময়ে কাঁচামাল আসবে না, আবার অনেকে সময় মতো রপ্তানি করতে পারবে না। তাদেরকে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এয়ার শিপমেন্ট করতে হবে। 
তিনি বলেন, দেশে এমনিতে ফিডার জাহাজ সংকট। এ অবস্থায় বিদেশি জাহাজ আটকা আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভয়াবহ বিপর্যয় হতে পারে। মাদার ভেসেলসমূহ বাংলাদেশমুখী পণ্যবোঝাই কন্টেইনার সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে নামিয়ে দেয়। ফিডার জাহাজগুলো সেসব কন্টেইনার নিয়ে আসে চট্টগ্রামে। আবার এখান থেকে ইউরোপ, আমেরিকার রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার নিয়ে যায় মাদার ভেসেলে শিপমেন্টের জন্য।
শিপিং সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে আলু রপ্তানির মওসুম। কিন্তু কোন শিপিংলাইন এ ধরনের পরিস্থিতিতে আলুর কন্টেইনার নেবে না। এ মামলা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। 
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, মামলার ফাঁদে জাহাজ আটকে পড়ার ঘটনায় বিদেশি মালিকদের মধ্যে আতংক ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাই প্রয়োজন আইনের সংস্কার ও যুগোপযোগী করা যাতে জাহাজ হয়রানিতে না পড়ে। আটকে পড়া এক একটি জাহাজের দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ডলার। 
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে একইভাবে মামলার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে যাওয়া বেশ কটি জাহাজ এখনও ফিরে যেতে পারেনি। এগুলোর মধ্যে দু-একটি জাহাজের ক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণে মামলা হলেও অন্যান্য জাহাজ স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আটকে দিয়েছে। এরমধ্যে দুটি দেশীয় জাহাজও আটক আছে প্রায় ৩ বছর ধরে। 
২০১৫ সালের ১৯শে মার্চ থেকে আটকে আছে গাগাসন যোহর। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী আতিকুর রহমান ২০১৫ সালের ১৮ই মে থেকে আটক রয়েছে। ২০১১ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি থেকে পানামা পতাকাবাহী সুইফট ক্রো আটক হয়।
জাহাজের আটকাদেশসমূহ পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আরজিতে আদালত আটকাদেশ প্রদান করে থাকে। এসব এডমিরালটি মামলা নিষপত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে জাহাজ মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর অবস্থানের কারণে স্থানীয় এজেন্ট বা প্রটেক্টিং এজেন্ট ব্যয়ভার বহন করতে পারে না। ফলে জাহাজের নাবিকরা নানা দুর্ভোগে পড়ে জাহাজ পরিত্যাগ করে চলে যান। জাহাজ নিয়ে পালিয়ে যেতেও বাধ্য হন। অতীতে এমভি ডেল্টা স্টার, এমভি জিংঈ জাহাজকে ফেলে চলে গিয়েছিলেন নাবিকরা। আর কোনো প্রকার পোর্ট ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই পালিয়েছিল টেকমেট পাইওনিয়ার জাহাজ। 
অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির আমদানিকারক এবং শিপিং এজেন্টদের শিকারে পরিণত হয় গম, ক্লিংকার, কয়লা, লবণবোঝাই বিদেশি জাহাজ। কোনো একটা অজুহাত তুলে তারা জাহাজ মালিকের কাছে থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নামে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ফন্দিফিকির শুরু করে। হুমকি দেয়া হয় এডমিরালটি কোর্টে মামলা দায়েরের। এরপরও জাহাজ মালিক রাজি না হলে মামলা করে দেয়। ১০ লাখ টাকা ক্ষতির জন্য ১০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করে বসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *