Home » Top 10 » দুঃসহ অপেক্ষা কান্না, আকুতি

দুঃসহ অপেক্ষা কান্না, আকুতি

ওদের কারও ছেলে, কারও স্বামী, কারও ভাই, কারও বাবা গুমের শিকার হয়েছেন। চার বছর ধরে তাদের অন্তহীন অপেক্ষা। নিখোঁজ হওয়া বাবা ফিরবেন- এমন আশায় ভোর হয় সন্তানের। বৃদ্ধ মা আর বাবার প্রতিটি সকাল আসে প্রিয় সন্তানের শূন্যতা নিয়ে। গতকাল এমন ২৭টি পরিবারের সদস্যরা জড়ো হয়েছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবে। স্বজন হারানো এসব মানুষের কান্না আর আকুতিতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

এ সময় দেশের বিশিষ্টজন আর মানবাধিকার কর্মীরা গুম হওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তারা বলেছেন, রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক গুম বা নিখোঁজ হলে তাদের খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যারা গুম হয়েছেন তাদের বিষয়ে বছরের পর বছর কোনো তথ্য না মেলা সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার প্রমাণ বহন করে। 
গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ‘মায়ের ডাক- সন্তানদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দাও’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা খাতুন লিখিত বক্তব্যে বলেন, ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর তেজগাঁও থানার বর্তমান ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আটজন নিখোঁজ হয়। একই বছরে ঢাকার বিভিন্নস্থান থেকে আরো ১৯ জন নিখোঁজ হয়। এছাড়াও সারা দেশে গুমের তালিকা দিন দিন বাড়ছে। এটা থামানোর জন্য কেউ যেন নেই। যেখানে রাষ্ট্রের দিকে সবাই তাকিয়ে থাকে সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সদস্যরা যখন নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যায় তখন সাধারণ মানুষ কার কাছে গিয়ে আশ্রয় নেবে। তিনি বলেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ একটি গুম রাজ্যে পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ ফিরে এলেও এখনো অধিকাংশ নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে। মাঝে মধ্যে ডোবায় ও নালায় পচা লাশ ভেসে উঠে। ওই লাশ শনাক্ত করে কবর দিয়ে স্বজনেরা এইটুকু সান্ত্বনা পায় যে অবশেষে হলেও লাশ তো পেলাম।
কিন্তু, বছরের পর বছর এখনো যারা গুম রয়েছে তাদের পরিবারের অবস্থা একবারও কি কেউ গভীরভাবে চিন্তা করেছে? গুম হওয়া অনেক সদস্যের পরিবারের কারও বাবা অথবা কারও মা দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য না করতে পেরে অকালে জীবন দিয়েছেন। 
তিনি আরো বলেন, আজও যারা বেঁচে আছেন তাদের এখনো আকুতি জীবনের শেষ দিন হলেও প্রিয় স্বজনকে যেন কাছে পান। হাজেরা খাতুন আরো বলেন, প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসেও সকল মানবাধিকার সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঐ অসহায় পরিবার তাদের সন্তানদের ফিরে পাওয়ার জন্য আকুতি জানিয়েছে। এ বিষয়ে কেউ কেউ কথা বললেও অধিকাংশই কেন জানি মুখে কুলুপ এঁটেছে। অতি সম্প্রতি গত ৪ঠা ডিসেম্বর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বের হাসান নিখোঁজ হয়েছেন। গত আগস্ট মাসে নিখোঁজ ১২ জনের মধ্যে ৪ জন ফিরে এসেছেন। গত ১০ই অক্টোবর সাংবাদিক উৎপল দাস বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। গত ২৭শে আগস্ট কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান নিখোঁজ হন। আজ তার নিখোঁজের ৯৮তম দিন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিএনপির সহ-সভাপতি ও বিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ গত ২২শে আগস্ট নিখোঁজ হন। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহমেদ গত ২৬শে আগস্ট ধানমন্ডির বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। কুমিল্লার লাকসামে বিএনপি নেতা হুমায়ুন পারভেজ ২০১৩ সালের ২৭শে নভেম্বর নিখোঁজ হন। 
তিনি বলেন, আজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা নতুন করে আর কোনো গুমের তালিকা দেখতে চায় না। তারা সকলে চান স্বজনদের কাছে তারা ফিরে আসুক। আমরা আবারো আজকের এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসের দিনে জাতিসংঘ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আবেদন জানাচ্ছি আপনারা আমাদের সন্তানদের তাদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেন। 
তিনি বলেন, আমার সন্তানের কোনো অপরাধ ছিল না। সে শুধু বিরোধী দলের রাজনীতি করতো। প্রায় চার বছর ধরে গুম হয়ে গেছে। তার নিখোঁজের কারণে আমি একটি রাত্রিও ঘুমুতে পারি না। তিনি চিৎকার করে কেঁদে বলেন, আমার সুমন বেঁচে আছে কিনা জানি না। তবে আমি আমার সন্তানকে কোলে ফিরে পেতে চাই। সরকারের কর্ণকোহরে যেন আমার এই আকুতিটি পৌঁছায়। মরে যাওয়ার আগে আমার ছেলেকে দেখে যেতে চাই। 
গুম হওয়া সুমনের বোন মারুফা ইসলাম বলেন, সবাই আমাদেরকে গুমের মা, বোন বা স্ত্রী হিসেবে চিনে। এ পরিচয় থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। ভাইকে ফিরে পেতে এমন কোনো জায়গা নেই আবেদন করিনি। কিন্তু ভাইকে আর ফিরে পাচ্ছি না। 
নিখোঁজ পিন্টুর স্ত্রী বলেন, ঘরের দরজা খুললে সন্তানরা মনে করে বাবা ফিরে এসেছে। কবে কখন আসবে তার উত্তর আমার কাছে নেই। এর সঠিক উত্তর সরকারই দিতে পারবে? 
অনুষ্ঠানে সংহতি প্রকাশ করে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, গত ৬ মাসে ৫২ জন গুম হয়েছে। গুম বিষয়ে সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন সেই বক্তব্যগুলো শুনে মনে হচ্ছে তারা মানবতার সঙ্গে প্রহসন করছেন। 
তিনি আরো বলেন, যেসব ব্যক্তি গুম হন তাদের পরিবারের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট থানায় যান অভিযোগ করতে। কিন্তু, তাদের সেইসব অভিযোগ আমলে নেয়া হয় না। যদিও বা নেয়া হয় তাহলে সেগুলো গভীরভাবে তদন্ত করা হয় না। কেন ওই ব্যক্তি গুম হলেন এ বিষয়ে গভীর তদন্ত না হওয়ার কারণে তদন্তের অগ্রগতিও হয় না। একারণে গুম হওয়া ব্যক্তিরা দিনের পর দিন নিখোঁজ হয়ে থাকছেন। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে পারে না সেই রাষ্ট্রের আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে।
মান্না আরো বলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশন পুলিশের কাছে গত ৫ বছরের মানবাধিকার প্রতিবেদন চেয়েছিল। কিন্তু, পুলিশ ওই প্রতিবেদন দেয়নি। এসব কারণে গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো রহস্যজনক হিসেবে থেকে যাচ্ছে। মান্না আরো বলেন, আজকের অনুষ্ঠান ভিডিও করে ইউটিউবে ছড়িয়ে দেয়া হোক। বিশ্ববাসী দেখুক, বাংলাদেশে কিভাবে দিন দুপুরে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। কিভাবে আইনের শাসনকে দিন দিন দুর্বল করা হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তার পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। 
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সরকারের হুকুম ছাড়া কিছুই হচ্ছে না দেশে। ফরহাদ মজহার আল্লাহর রহমতে ফিরে এসেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায়। তিনি বলেন, গুম হওয়া মানুষের কান্না সরকারের কাছে পৌঁছে না। সরকারের কিছু কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন সভা ও সমাবেশে বলে বেড়াচ্ছেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মানবতার মা? এই অমানবিক কাজ বন্ধ করুন। প্রধানমন্ত্রী আপনি গুম ও খুন বন্ধ করতে না পারলে রোবট সুফিয়াকে দায়িত্ব দিয়ে দেন। 
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, আমরা অব্যাহতভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে নিখোঁজের ঘটনা ঘটছে। যারা ভিকটিম তাদের কাছে শুনতে পাই যে, বাড়ি থেকে অথবা রাস্তা থেকে অথবা কর্মস্থল থেকে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যারা ধরে নিয়ে গেছেন তারা নিজেদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক বলে পরিচয় দিয়েছেন। কারও শরীরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক দেখা গেছে বলে আমরা ভিকটিমের পরিবারের মুখ থেকে শুনেছি। তারা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর এখনও অবধি খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যরা এখনো পথ চেয়ে বসে আছেন। এটা যে কি কষ্টের যারা গুম হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরাই বুঝতে পারেন। 
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, হঠাৎ করে যখন একটা মানুষ হারিয়ে যায় তখন সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের মধ্য থেকে কিছু অতি উৎসাহী লোক রাষ্ট্রকে অশান্ত করার জন্য এসব কাজ করছে কি-না তা আমাদের জানা দরকার। তিনি আরো বলেন, গুমের যন্ত্রণা কোনো দিন শেষ হয় না। গুমের পর অপেক্ষা করা মৃত্যুর চেয়ে অনেক কঠিন। অনেক স্বজন শোক সহ্য করতে না পেরে মারা গেছেন। 
তিনি আরো বলেন, আমরা ভিকটিমের স্বজনদের কাছে শুনতে পাই যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরে তাদের ধরে নিয়ে গেছে। কেউ বলেছেন যে, ডিবি পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কেউ বলেছেন, র‌্যাব ধরে নিয়ে গেছে। ইউনিফরম না থাকলেও সাদা পোশাকে তারা নিজেদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়েছেন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সি আর আবরার বলেন, একটা ভয়ের আবহাওয়া ও পরিস্থিতির মধ্যে এখানে গুম হওয়া স্বজনরা এসেছেন। এই ভয়ের আবহাওয়ার মধ্যে আমাদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা নেই। আমরা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই না যে, কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই নিখোঁজ হওয়া সদস্যদের কান্না পৌঁছায় না, না তিনি শুনতে চান না। 
তিনি আরো বলেন, গুমের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে বিচার করতে হবে। নাগরিকদের নিরাপত্তা দান করা এবং নিখোঁজদের খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এটা না করলে রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি কারও আস্থা থাকে না। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন তারা কেন গুমের ব্যাপারে নীরব রয়েছেন তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। 
বাম নেতা কমরেড ফয়জুল হক লালা বলেন, গুমবাদীদের বিদায় ঘণ্টা বেঁজে গেছে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ধরে ধরে গুম করছে। তাদের এখন বিচার না হলেও ভবিষ্যতে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে বিচার করা হবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *