Home » Top 10 » রাজধানীতে গ্যাস সংকট

রাজধানীতে গ্যাস সংকট

উত্তরখানের আটিপাড়ার বাসিন্দা গৃহিণী ইয়াসমিন মাহমুদা বললেন, গ্যাস নিয়ে বলার কিছু নেই। গ্যাস সকাল ৬টায় যায়, রাত ১২টায় আসে। এই এলাকায় গ্যাসের অবস্থা শোচনীয়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে একটি সিলিন্ডার কিনেছেন তিনি। এতে বাড়তি খরচ হচ্ছে, পরিবারের মাসিক বাজেট কাটছাঁট করতে হচ্ছে। অভিযোগ করেন নিয়মিত গ্যাস না পেয়েও গ্যাস বিল দিতে হচ্ছে।

তার দুটি বাচ্চা নিয়ে শীতে ব্যাপক সমস্যায় আছেন বলে উল্লেখ করেন এ গৃহিণী। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, প্রচণ্ড শীত। তাদের জন্য পানি গরম করতে হয়। অথচ গ্যাস থাকছে না।
রাজধানী গণকটুলী এলাকার বাসিন্দা লিজা আক্তার বলেন, তাদের এলাকায় গত দুই-তিন দিন ধরে সকালে ব্যাপক গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সকালবেলা গ্যাসের গতি কম থাকে। তাই নিরুপায় হয়ে রাতের বেলায় রান্নার কাজ শেষ করে রাখতে হয়। উত্তর শ্যামলী ও পশ্চিম আগারগাঁও এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই এলাকায় সকাল ৭টার আগেই গ্যাসে চলে যায়। আবার রাত ১১টার পরে আসে। এর ফলে তাদের রান্না-বান্নায় ব্যাপক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। নজরুল ইসলাম নামের এক বাসিন্দা বলেন, বাচ্চাদের জন্য বাইর থেকে খাবার কিনে আনতে হচ্ছে। শুধু উত্তরখান, লালবাগ বা শ্যামলী ও পশ্চিম আগারগাঁও নয়, রাজধানীজুড়ে গ্যাসের সংকট প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীত জেঁকে বসতে না বসতেই নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় গ্যাস সংকটে সমস্যা হচ্ছে নিত্যদিনের রান্নায়। অধিকাংশ এলাকায় সকাল থেকে বিকেল অবধি গ্যাসের চাপ নেই বললেই চলে। ফলে বাধ্য হয়ে রাতে অথবা কাকডাকা ভোরে দিনের রান্নার কাজ শেষ করতে হচ্ছে গৃহিণীদের। ঢাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট নতুন কিছু নয়। তবে আগে ছিল শুধু শীতকালে, এখন সারা বছর। গ্যাসের দাম চলতি বছর দেড় গুণ বাড়লেও গৃহিণীদের দুর্ভোগ কমেনি বরং বেড়েছে। তিতাসের পাইপলাইন গ্যাস সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রাজধানীর বহু এলাকায় এখন সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন গৃহিণীরা। কারণ তিতাসের গ্যাস সারাদিনই থাকে না। অনেকেই বলছেন, তারা বড় বিপাকে আছেন। কারণ তিতাসের লাইনের গ্যাস না পেলেও প্রতি মাসে তাদের বিল গুনতে হচ্ছে। 
যেসব এলাকায় গ্যাসের ব্যাপক সংকট হচ্ছে- মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, পশ্চিম আগারগাঁও, মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, পশ্চিম ধানমন্ডি, লালবাগ, সোবহানবাগ, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, কামরাঙ্গীরচর, উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, যাত্রাবাড়ীর একাংশ, দক্ষিণ বনশ্রী, মগবাজার এলাকায় গ্যাসের ভয়াবহ সমস্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় সারাদিন চুলা জ্বলে না। জ্বললেও মিটমিট করে। কোথাও সকালেই গ্যাসের চাপ কমে যায়। কোথাও সন্ধ্যায় গ্যাস পাওয়া যায়। গ্যাসের চাপ পাওয়া যায় মূলত রাত ১১টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের কর্মকর্তারা বলেন, রাজধানীতে গ্যাসের চাহিদা ও ব্যবহার শতকরা ২০ ভাগ বেড়েছে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গরমকালেই অনেক সময় গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হয়, আর এখন শীতের কারণে চাহিদা অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সংকট দেখা দিয়েছে।
রাজধানীর আজিমপুরের বাসিন্দা ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, তাদের বাসায় গ্যাসের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। গত দু’দিন ধরে লাইনে গ্যাস না থাকায় ঘরে রান্নাবান্না বন্ধ। এ সময় বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হয়েছেন তারা। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা ডলি আক্তার বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটে খুব সমস্যায় পড়েছেন। সকাল ৭টা বাজতে না বাজতেই গ্যাস চলে যায়। লাইনে টিপ টিপ করে গ্যাস আসায় রান্নাবান্না বন্ধের উপক্রম হয়েছে। অনেক গৃহবধূ চুলায় হাঁড়ি চড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে গ্যাস আসার অপেক্ষা করছেন। নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও প্রয়োজনের সময় গ্যাস পাচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী এপ্রিল মাসে এলএনজি আমদানি শুরু হলে গ্যাসের ঘাটতি ৫০ শতাংশ দূর হবে। তখন পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তখন আবাসিক এলাকায় গ্যাস সংকট থাকবে না। জানা যায়, রাজধানীতে গ্যাস সমস্যার একটি বড় কারণ চুরি। আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অবৈধভাবে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। তিতাস গ্যাস কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীতে তীব্র আকারে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। এ কারণে আবাসিকে চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস কোম্পানি ও জ্বালানি বিভাগ, সিএনজি স্টেশন মালিক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত চারটি কারণে বর্তমানে গ্যাসের সংকট প্রকট। এগুলো হলো- চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি, বিতরণ পাইপ লাইনে সীমাবদ্ধতা, বসতি বেড়ে যাওয়া ও অবৈধ সংযোগ। 
এই ব্যাপারে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতিই সমস্যার মূল কারণ। রাজধনীতে গ্রাহকের চাহিদা দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ১৭০০ ঘনফুট গ্যাস। আগে থেকেই প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সংকট রয়েছে। এর সঙ্গে শীতে একটু চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে গ্যাসের সংকট বেড়েছে। কিছু কিছু এলাকায় বিতরণ লাইনগুলো অনেক সরু। ফলে লাইনের শেষ প্রান্তে যারা বাস করেন, তাদের গ্যাস পেতে সমস্যা হয়। তিনি আশা করেন শিগগিরই এ সমস্যা দূর হবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *