Home » Top 10 » রিকশার প্যাডেলে জীবনের চাকা

রিকশার প্যাডেলে জীবনের চাকা

কার্লাইল বলেছেন-‘জীবন নিষ্ফল নয়, নির্মম বাস্তবতা।’ জীবনের কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে বহু আগেই সম্যক ধারণা দিয়েছিলেন এই বিশ্বখ্যাত দার্শনিক। হয়তো তিনি জানতেন, জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে সংগ্রাম নামক ছায়াচিত্র’র কথা। আজ কার্লাইল নেই, আছে তাঁর অমর উক্তি। তাঁর এসব অমর উক্তির বহু উদাহরণ সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। তেমনি এক উদাহরণ হিসেবে জীবন সংগ্রাম করে টিকে থাকা এক কিশোরের নাম জসীম মিয়া (১৫)। বিয়ানীবাজার পৌরশহরের দাসগ্রামের একটি ভাড়া বাসায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করে সে।

পিএইচজি হাইস্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র জসীম রিকশা চালায়। রিকশার প্যাডেলে ঘুরে তার জীবন-জীবিকার চাকা! স্কুলছাত্র জসীম জানায়, কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার গোজাদিয়া হাইধনখালী গ্রামে তাদের বাড়ি। সেখানে শুধু দুই কক্ষের ঘর করার মতো জমি আছে। গ্রামের বাড়িতে তাদের সহায়-সম্পদ বলতে আর কিছুই নেই। তাই সংসার সাজাতে পিতা চলে আসেন বিয়ানীবাজারে। এখানে প্রথমে হাতাগাড়ি, পরে রিকশা চালিয়ে সন্তানদের বড় করেন মীর হোসেন। এরপর রোগে-কষ্টে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন অভাবী পিতা। সংসারের ভার এসে পড়ে জসীম মিয়ার উপর। এতে মোটেও বিচলিত হয়নি সে। বরং অদম্য মনোবল নিয়ে রিকশার প্যাডেল ঘুরাতে শুরু করে জসীম। এখন ওই প্যাডেলের সঙ্গে ঘুরে তাদের জীবিকার চাকা। রিকশার মালিক জসীম নিজে একটি এনজিও’র কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এটি কেনেছে। তার দৈনিক আয় ৪-৫শ’ টাকা। ৯ম শ্রেণিতে জসীমের রোল ৬১। সে নিয়মিত ২-৩ ঘণ্টা পড়তে পারে। দিনে রিকশা চালিয়ে রাত জেগে পড়া কঠিন, তাই ইচ্ছা থাকলেও শরীর মানে না। জসীম জানায়, সে নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে কখনো বেশি টাকার ট্রিপ পেলে স্কুল মিস করে। যেদিন স্কুলে আসা হয় না, সেদিন রাত ৮টার দিকে রিকশা বন্ধ করে বাসায় ফিরে। আবার স্কুলে উপস্থিত হলে ছুটি শেষে রিকশা নিয়ে বের হয়, ফিরে মধ্যরাতে। তখন হাতে থাকে কুপি বাতি জ্বালানোর কেরোসিন, ছোট বোনের বায়নার বিস্কুট, অসুস্থ বাবার ঔষুধ, সংসারের জন্য মায়ের বলে দেয়া সদাইপাতি। তার স্কুলের বেতন মওকুফ করা হয়েছে। শুধু পরীক্ষার ফি দিতে হয়। তার মা বেদানা বেগম জানান, পরীক্ষার সময় আসলে আমার ছেলে ২-৩ ঘণ্টা রিকশা চালায়। আর না হলে ৬-৭ ঘণ্টা সে আমাদের খাবারের অন্বেষণ করে। তিনি বলেন, ৩ মেয়ে ও ১ ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ের সংসারে দুই সন্তান রয়েছে। কিন্তু মেয়ের জামাই কারাগারে থাকায় সন্তানসহ মেয়েটি তাদের বাসায় চলে এসেছে। কয়েক বছর থেকে একমাত্র ছেলে জসীম ৮ জনের সংসার চালিয়ে যাচ্ছে। পিতা মীর হোসেন জানান, তার অপর দুই মেয়ের মধ্যে মেঝো মেয়ে বিয়ানীবাজার আদর্শ মহিলা কলেজে এবং ছোট মেয়ে গৌরিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। সবই ওই জসীমের উপর নির্ভরশীল। জসীম মিয়া বলেন, পত্রিকায় লিখলে আমার কোনো লজ্জা নেই। বরং এটা আমার গর্ব, অহঙ্কার। আমি আমার বাবা-মা’র জন্য আরো বেশি কিছু করতে রাজি। আমি বিশ্বাস করি- জন্ম হোক যথাতথা/কর্ম হোক ভালো। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *