Home » Top 10 » সিভিল এভিয়েশন স্কুলে নানা অনিয়ম, অফিস সহকারী আত্মসাৎ করলো আড়াই কোটি টাকা

সিভিল এভিয়েশন স্কুলে নানা অনিয়ম, অফিস সহকারী আত্মসাৎ করলো আড়াই কোটি টাকা

নানা অনিয়মে নিমজ্জিত রাজধানীর সিভিল এভিয়েশন স্কুল। স্কুলটির আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা। এ নিয়ে তারা আন্দোলনে নেমেছেন। স্কুলটির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছে প্রধান অফিস সহকারী জামসেদ আলী। ২০০৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত এ টাকা আত্মসাৎ করেন তিনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার তিনটি এবং তার স্ত্রী সালমা আক্তার বীথির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছেন।

তিনটি মামলায় ওই কর্মচারীকে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য সময় বেঁধে দেয়াসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হলেও তার স্ত্রীর নামে করা মামলাটি খালাস করে দেন আদালত। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। পুরো ঘটনা তিনবার তদন্ত করেছে সিআইডি। এছাড়াও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির পক্ষে মাউশি আলাদা আলাদা তদন্ত করে টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে। আত্মসাৎ করা টাকা দিয়ে ওই কর্মচারী শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ, বায়িং হাউজের শেয়ার, দু’টি ফ্ল্যাট,  ডেসটিনি এবং ৫০ লাখ টাকা দিয়ে ঢাকায় একটি জায়গা কিনেছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরের দিন স্কুলে জামসেদের লকার ভেঙে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা উদ্ধার করেন প্রধান শিক্ষক। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় আরও ৮ লাখ টাকা স্কুলকে ফেরত দেন। জমি বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা ফেরত দেয়ার শর্তে বর্তমান প্রধান শিক্ষকের কাছে জিম্মায় থাকা জমির দলিল কৌশলে নিজের হাতে নেয়ার পর সেই টাকা ফেরত দেননি। এছাড়াও চার দফায় আরও ৮ লাখ টাকা ফেরত দিলেও বাকি টাকা না দিয়ে এখন তিনি আত্মগোপনে। পুরো ঘটনায় শিক্ষক অভিভাবকদের মধ্যে তোলপাড় চলছে। এছাড়া সিআইডি’র তদন্তে ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন ডকুমেন্ট থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ১লা এপ্রিল থেকে ২০১৪ সালে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত স্কুলের তহবিলের গড়মিল পাওয়া যায় ২ কোটি ২২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। পুরো টাকা আত্মসাৎ হয়েছে বলে প্রমাণ পায় সিআইডি’র তদন্ত কমিটি। আত্মসাতের তদন্ত করতে গিয়ে কমিটি দেখতে পায়, ২০০৯ সালে ১লা এপ্রিল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন শাহজাহান মিয়া। তার সময় আত্মাসাৎ হয় ২৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। এরপর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমানের দায়িত্বকালে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়। বর্তমান প্রধান শিক্ষকের ২০১৩ হতে ২০১৪ সালের ১২ই আগস্ট পর্যন্ত গরমিল পাওয়া যায় ৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা। এরমধ্যে বর্তমান প্রধান শিক্ষক সুধন্য কুমার বাড়ৈ চারবারে মোট ৮ লাখ টাকা উদ্ধার করে স্কুলের হিসাবে জমা দিয়েছেন। ঘটনা জানার পরের দিন ওই অফিস সহকারীর আলমারি ভেঙে আরও ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা উদ্ধার করেন। 
তদন্তে সূত্রে আরও জানা গেছে, ওই সময়কাল জাহাঙ্গীর গেট সংলগ্ন অগ্রণী ব্যাংক, বিমানবাহিনী শাখায় এ স্কুলের টাকা জমা দিতেন জামসেদ। ওই সময় স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি, প্রধান শিক্ষক পদ নিয়ে মামলাসহ নানা জটিলতা চলছিল। ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যাংকে টাকা জমা না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিতেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যাংক হিসাবের তথ্য আনতে যাননি। জামসেদ ব্যাংকের ডেস্ক অফিসারদের ম্যানেজ করে বিভিন্নি সময় জাল ব্যাংক বিবরণী স্কুলের এনে দিতেন। এভাবে চলতে থাকে সাত বছরের বেশি সময়। বিভিন্ন সময় স্কুল কর্তৃপক্ষ ব্যাংকে গেলেও তাদের মূল বিররণী দেখানো হতো না। বর্তমান প্রধান শিক্ষক সুধন্য কুমার বাড়ৈ ২০১৩ সালে ১লা মে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার পরও কয়েক মাস এভাবে চলতে থাকে। তাকেও বিভিন্ন সময় জাল বিবরণী দেখানো হয়। একদিন তার সন্দেহ হলে তিনি নিজেই ব্যাংকে যান। তখন ডেস্ক অফিসার জামসেদকে ফোন দেন। জামসেদ ফোন না ধরায় প্রধান শিক্ষককে বিবরণী দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন ব্যাংক কর্মকর্তা। তখন প্রধান শিক্ষক ব্যাংকের ম্যানেজারের সহায়তায় হিসাব বিবরণী নিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি ধরতে পারেন। পরে জামসেদ নিজের ভুল স্বীকার করে টাকা ফেরত দেয়ার কথা জানান। এবং স্ট্যাম্পে সম্মতিপত্র দেন। এরপর জামসেদ নিজেই ২০১৪ সালের আগস্টে ১ লাখ টাকা এবং সেপ্টেম্বরে ৪ লাখ টাকা স্কুলের অ্যাকাউন্টে জমা দেন। আরও দুই দফায় ২ লাখ এবং ১ লাখ করে মোট ৮ লাখ টাকা জমা দেন। আর তার লকার ভেঙে উদ্ধার হয় ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। ২০১৪ সালের অক্টোবরে জমির বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকা দেয়া হবে এই শর্তে স্কুলের জিম্মায় রাখা জমির দলিল নেন তার স্ত্রী। কিন্তু জমির বিক্রি করলেও সেই টাকা জমা দেয়া হয়নি। টাকা জমা না দেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে ২০১৫ সালে জানুয়ারিতে লিখিত একটি জবানবন্দি দেন জামসেদ। আরও কয়েক দফা সময় চান স্কুলের কাছে। এরমধ্যে তার বিরুদ্ধে চেক প্রতারণার তিনটি মামলা এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা চলছিল। এই মামলার গুলো ব্যাপারে লিখিত জবানবন্দি দেন জামসেদ। এর পর থেকে তিনি লাপাত্তা। 
পুরো ঘটনার ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুধন্য কুমার বাড়ৈ মানবজমিনকে বলেন, আমি যোগদান করার সময় স্কুলের নানা সমস্যা ছিল। প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে মামলাসহ নানা ঝামেলা ছিল। এরপর বিষয়টি জানার পর এক ধরনের যুদ্ধ করতে হয়েছে। প্রতি সপ্তাহ কোর্টে হাজিরা দিতে হয়েছে। তিনটি মামলা আমরা জিতেছি। জামসেদের স্ত্রীর বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় আমরা হারলেও এটি হাইকোর্টে আপিল করেছি। তার সময়কালে ৯ লাখ টাকা আত্মাসাতের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি ব্যাংকে গেলেও আমাকে জাল বিবরণী ধরিয়ে দিতো। ওই দিন ম্যানেজারের সহায়তা মূল বিবরণী না নিলে হয়তো আরও সময় ধরে এটা চলতে থাকতো। তিনি বলেন, আমরা সর্ব্বোচ চেষ্টা করছি এই টাকা উদ্ধার করার। 
অন্যদিকে স্কুলের অভিভাবকরা এ ঘটনার জন্য তৎকালীন প্রধান শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির সায় ছিল বলে অভিযোগ করে আসছেন। স্কুলের নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দূর করার দাবি জানিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। অভিভাবকদের একজন মাহমুদ বাবু। তিনি বলেন, স্কুলে কোটি টাকা আত্মসাৎ হওয়ার পর জামসেদকে পুলিশে না দিয়ে কেন ছেড়ে দেয়া হলো। তার অভিযোগ, গভর্নিং কমিটি ও স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ একটি চত্রু এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। না হলে তার বিরুদ্ধে কেন চেক প্রতারণা মামলা করা হবে? এ ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে স্কুল কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডকে বলেছিল। কিন্তু শিক্ষা বোর্ড দুই বছরে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অন্যদিকে স্কুলে তিন বছরে একাধিকবার বেতন-ভর্তি ফি বাড়ায়। এবারও সেই বেতন-ভর্তি ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নিলে অভিভাবকদের আন্দোলনের মুখে স্থগিত করা হয়েছে।   
এদিকে অনিয়ম সংক্রান্ত এক মামলার রায়ে স্কুলের একজন অফিস সহকারী প্রধান শিক্ষক বা ম্যানেজিং কমিটির লোকজনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদত বা সহযোগিতা ছাড়া একার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করার সুযোগ থাকার কথা নয় বলে উল্লেখ করা হয়। রায়ে বলা হয়, এ রকম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে যোগ্য লোক নিয়োগ না দিয়ে একের পর এক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি আদালতের যথেষ্ট সন্দেহ হয়েছে। কাজেই আসামি এই স্কুলের টাকা আত্মসাৎ করে থাকে তবে তার সঙ্গে এই সময়কালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের প্রত্যেক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অথবা এ ধরনের আত্মসাতের দায় অদক্ষ প্রধান শিক্ষকরা এড়াতে পারেন না। মামলার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হলেও আদালত মনে করে, সুষ্ঠুভাবে স্কুল পরিচালনার জন্য এ ধরনের অদক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে বাদ দিয়ে অবিলম্বে নতুন করে একজন যোগ্য প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, স্কুলের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক রতন কুমার পালকে এক শিক্ষিকাকে যৌন হয়রানির কারণে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু এখনও তিনি স্কুলে বহাল তবিয়তে আছেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *