Home » বাংলাদেশ » জেলার খবর » সিলেটের ঐতিহ্যগাথা শীতল পাটি

সিলেটের ঐতিহ্যগাথা শীতল পাটি

নদীবিধৌত সিলেট, অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। সুরমা নদীর পাশাপাশি খাল-বিলে পরিপূর্ণ সিলেট। এসব খাল-বিল, নদী-নালার পাড়ে জন্ম নেয় মুর্তা গাছ। এই গাছ দিয়েই তৈরি হয় শীতল পাটি। শীতল পাটি জড়িয়ে আছে সিলেটের ঐতিহ্যের সঙ্গে। তবে যুগের হাওয়া বদলের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে শীতল পাটি।

বংশ পরম্পরায় কিছু পরিবার এই পেশা ধরে রাখলেও অধিকাংশ পরিবার বেছে নিয়েছে অন্য পেশা। বাসা, রেস্টুরেন্ট, গাড়ি, মসজিদ, মন্দির সহ বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার হয়ে থাকে আবার শোভাবর্ধনেও ব্যবহৃত  হয় এই পাটি। বিয়ের অনুষ্ঠানে শীতল পাটি উপহার দেয়ার পাশাপাশি বর-কনের বসার স্থানে ব্যবহার প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শীতল পাটির শীতল পরশ বাংলাদেশের পাশাপাশি ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, জাপান, জার্মানি সহ অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। বৃটিশ আমলে ভিক্টোরিয়ার রাজপ্রাসাদে স্থান পেয়েছিল সিলেটের শীতল পাটি। কথিত আছে মুর্শিদ কুলি খাঁ নীল শীতল পাটি উপহার দিয়েছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবকে। 
শীতল পাটি নামের মাঝেই রয়েছে এর গুণ। এই পাটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গরমে ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। শীতলতার পাশাপাশি নানান নকশা, রং ও বুনন কৌশল মুগ্ধ করে সকলকে। প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ার কারণে স্বাস্থ্যসম্মত এই পাটি। সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে শীতল পাটি তৈরির কাজ। সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার শ্রীনাথপুর, আতাসন, গৌরিপুর, লোহামোড়া, হ্যারিশ্যাম, কমলপুর ইত্যাদি এলাকায় শীতল পাটি তৈরি হয়। এছাড়াও সিলেটের বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, পাবনায় কিছু কারিগরের দেখা মেলে। সিলেটের এই ঐতিহ্য ভারতেও প্রচলিত আছে। দেশ ভাগের সময় হিন্দুস্থানে পাড়ি জমিয়ে কুচবিহারে আবাস গড়েন শীতল পাটির কিছু কারিগর। সেখানেও তারা বজায় রাখেন তাদের পারিবারিক পেশা। 
মুর্তা বা পাটিপাতা কেটে প্রথমে বেতি বের করে তা শুকানো হয়। এরপর তা ভিজিয়ে রাখার পর একঘণ্টা পানিতে সেদ্ধ করা হয়। পাটিতে রং দেয়ার প্রয়োজন হলে তা সেদ্ধ বেতিতে দিয়ে শুকানো হয়। বেতির সাইজ ও মাপ অনুযায়ী কেটে শিল্পীর হাতের বুননে তৈরি হয় শীতল পাটি। এক একটি শীতল পাটি তৈরিতে মাপ ও নকশা ভেদে সময় লাগে ২ থেকে ৫ দিন আবার র্স্বোচ্চ ৪ থেকে ৬ মাস। পাটিতে শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠে প্রকৃতি, পশুপাখি ও প্রিয়জনের অবয়ব ইত্যাদি।
এসব শীতল পাটি বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন সিকি, আধলি, টাকা, নয়নতারা, আসমান তারা, আনুমতি ইত্যাদি। তবে সিকি, আধলি ও টাকা ব্যাপক পরিচিত। পাটিগুলো সাধারণত ৭ ফুট বাই ৫ ফুট হয়ে থাকে। সিকি খুবই মসৃণ হয়। কথিত আছে সিকির উপর দিয়ে সাপ চলাচল করতে পারে না মসৃণতার কারণে। সিকি তৈরিতে সময় লাগে ৪ থেকে ৬ মাস। আধলি মসৃণতা কম হয় এবং এর বুননে নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। একটি আধলি তৈরিতে সময় লাগে ৩ থেকে ৪ মাস। টাকা জোড়া দেয়া শীতল পাটি দুই বা তার অধিক জোড়া থাকে টাকাতে। এগুলো অত্যন্ত মজবুত হয়। ২০ থেকে ২৫ বছরেও নতুন থাকে এই পাটিগুলো। টাকার মাঝেও ফুটিয়ে তোলা হয় নানান নকশা। টাকায় একজন কারিগরের সময় লাগে ২ থেকে ৩ মাস। এসব পাটির পাশাপাশি কিছু সাধারণ পাটি আছে যা তৈরি করতে সময় লাগে ১ থেকে ২ দিন। 
পাটির দাম নির্ভর করে সাধারণত বুনন কৌশল ও নকশার উপর। সর্বনিম্ন ২ থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে এক একটি পাটির দাম। তবে পাটির কদর কমে যাবার পর থেকে বেতি দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানান উপকরণ যেমন ওয়ালেট, ব্যাগ, ফুলদানি, টেবিল ম্যাট, গহনার বাক্স, খেলনা ইত্যাদি। বিশেষ করে পর্যটন এরিয়ায় এর চাহিদা ব্যাপক। বেতি দ্বারা উৎপাদিত এসব পণ্য নতুন বাজার সৃষ্টি করার কারণে অনেক কারিগর আগ্রহী হয়ে উঠছে আবারো। আজ বিকাল ৫টায় জাতীয় জাদুঘরে নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে শুরু হচ্ছে এক বিশেষ প্রদর্শনী। চলবে আটদিন। এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *