Home » Top 10 » ২০১৭ সাল ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর

২০১৭ সাল ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ২০১৭ সাল দেশে ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। চলতি বছরও ব্যাংকখাতের ঘটনাগুলোর কোনো নিরসন হবে বলে মনে হচ্ছে না। এর প্রভাব চলতি বছরও থাকবে। সরকারের ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে অর্থনৈতিক অনেক সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচনের বছর হিসেবে চলতি বছর অর্থনীতির জন্য আরো ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ‘রক্ষণশীল’ নীতি গ্রহণ করতে হবে সরকারকে।

গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি-২০১৭-১৮ অর্থবছর-প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উপস্থিত ছিলেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। পর্যালোচনায় ব্যাংক খাত, রোহিঙ্গা ও বন্যার বিষয়টি নিয়ে বিশেষ আলোচনা করা হয়। 
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের অভাবে ধনী-গরিবের সম্পদ বৈষম্য আরো বেড়েছে। কমেছে দারিদ্র্য হ্রাসের হার। এতে জানানো হয়, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মানুষের আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের ০.২৩ শতাংশ আসে সবচেয়ে দরিদ্রদের ৫ ভাগ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল ০.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশের অবদান ২৭.৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪.৬১ শতাংশ ছিল বলে সিপিডির হিসাব। অর্থাৎ ধনীরা ২০১০ সালে যা আয় করতেন, ২০১৬ সালে এসে এরচেয়ে বেশি আয় করছেন, অন্য দিকে আয় কমেছে গরিবদের।
সিপিডির হিসাবে, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশের খানা প্রতি আয় (হাউজহোল্ড ইনকাম) ২০০৫ সালে ছিল ১১০৯ টাকা, যা কমে ২০১৬ সালে ৭৩৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ধনী ৫ শতাংশের খানাপ্রতি আয় ৩৮ হাজার ৭৯৫ থেকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ৮৮,৯৪১ টাকা। ২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৫১.৩২ ভাগ ছিল সর্বোচ্চ ধনী ৫ শতাংশের কাছে, অন্যদিকে ০.০৪ ভাগ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র ৫ ভাগের কাছে।
প্রবন্ধে সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছায়নি। গরিবরা আরো গরিব হচ্ছে, ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। 
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রার মধ্যে এই বৈষম্য বাড়ার জন্য প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের অভাবই দায়ী। বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে একটি শোভন প্রবৃদ্ধির হার রক্ষা করতে পেরেছে। কিন্তু এই শোভন প্রবৃদ্ধির হারের নিচে যে অন্ধকারটি রয়েছে সেটি হলো দেশের ভেতরে সে তুলনায় কর্মসংস্থান না হচ্ছে না, দারিদ্র্যবিমোচনের হার শ্লথ হয়েছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বৈষম্য শুধু আয়ে আর ভোগে বৃদ্ধি পায়নি, সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে সম্পদের বৈষম্য। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকে ঋণের টাকা ফেরত না দেয়া, বড় বড় প্রকল্পের ভেতর থেকে বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ ভিন্ন দিকে পরিচালনা করাকে চিহ্নিত করেন তিনি।
দেবপ্রিয় বলেন, আমরা যতখানি না প্রবৃদ্ধির পরিমাণ নিয়ে চিন্তিত থাকতাম, এখন সময় হয়েছে সেই প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিয়ে চিন্তা করার। প্রবৃদ্ধি যে পরিমাণ মানুষকে উপরে তোলার কথা সে পরিমাণ তুলতে পারছে না। তিনি জানান, ২০০০ থেকে ২০০৫ সালে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল ১.৮ শতাংশ, যা ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে নেমে হয়েছে ১.২ শতাংশ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ৩.৩ থেকে কমে হয়েছে ১.৯ শতাংশ। অর্থনৈতিক বৈষম্য ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্লেষণ বলে, যদি একটি দেশের ভেতরে ক্রমান্বয়ে আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা প্রবৃদ্ধির হারের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে অর্থাৎ যত বেশি বৈষম্য দেশে আছে সে দেশে প্রবৃদ্ধির হার উপরের দিকে নেয়া তত বেশি সমস্যা। 
২০১৭ সাল ব্যাংক কেলেঙ্কারির বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে বলে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চলতি বছরও ব্যাংক খাতের ঘটনাগুলোর কোনো নিরসন হবে বলে মনে হচ্ছে না। ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি দিয়ে বোঝা যায়, সংস্কারের বিষয়ে সরকারের মনোভাব কী রকম ছিল। দেবপ্রিয় বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। চাপের মুখে পড়েছে। এটা সামাল দিতে আমরা যে সংস্কারের কথা বলেছিলাম, তা সামনের দিকে এগোয়নি বরং পেছনের দিকে গেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্যাংকিং খাত।
২০১৭ সালে ব্যাংক খাতে কী কী হয়েছে, তা তুলে ধরে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ব্যাংকে অপরিশোধিত ঋণ বেড়েছে, সঞ্চিতির ঘাটতি বেড়েছে, অপরিশোধিত ঋণে গুটিকয়েকের প্রাধান্য তৈরি হয়েছে, জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে, বিভিন্ন ব্যক্তি খাতের ব্যাংকে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মালিকানার বদল হয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া নতুন ব্যাংক কার্যকর হতে পারেনি এবং এখন দেখা যাচ্ছে ব্যক্তি খাতের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, এগুলোর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষেধক ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার উল্টো ব্যাংকিং আইন সংশোধন করে ব্যাংকে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ বাড়াল। সামগ্রিক এই পরিস্থিতির জন্য দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করেন তিনি। তার মতে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বমূলক ভূমিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতি তিন জায়গায়, সংস্কারের উদ্যমের অভাব, সমন্বয় করতে না পারা এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতায় দুর্বলতা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যক্তির পরিবর্তনের কথা তিনি বলেননি। এটা সমাধানও নয়। ব্যবস্থাপনা ও নীতি উদ্যোগের মনোভঙ্গি এবং সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া পরিবর্তন না হলে ব্যক্তির পরিবর্তন বড় বিষয় নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। দেবপ্রিয় বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা আগের তুলনায় এখন আরো বেশি নাজুক। সরকার যদি এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয় তাহলে তার প্রভাব থাকবে ২০১৮ সালেও। সঙ্গে নতুন ব্যাংকের অনুমোদন আরো ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অভিযোগ করে তিনি বলেন, ঋণের ওপর কয়েকটি ব্যাংকে ব্যক্তির প্রাধান্য বিস্তার করছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যক্তি খাতের নতুন ব্যাংক কার্যকর হতে পারেনি। এসব ব্যাংক থেকে বিদেশে টাকাও পাচার হচ্ছে। সরকার এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে তুলা আমদানি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও উৎপাদনে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ৮০ ভাগই আমদানি-রপ্তানি মূল্য কারসাজির মাধ্যমে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খতিয়ে দেখা উচিত। 
মূল প্রবন্ধে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে বলা হয়, বর্তমান প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রতিদিন যদি ৩০০ জন ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে সময় লাগবে কমপক্ষে ৭ বছর এবং এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ৪৪৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর যদি প্রতিদিন ২০০ জন ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে সময় লাগবে কমপক্ষে ১২ বছর। এতদিনে খরচ হবে কমপক্ষে ১ হাজার ৪৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
সিপিডির শেষ পরামর্শে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। আর নির্বাচনকে ঘিরে অর্থনীতি বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এ ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় রক্ষণশীল নীতিতে চলার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। ঋণ কমাতে হবে, টাকার মূল্যমান ঠিক রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে চালের দাম কমাতে হবে। নির্বাচনী বছরে বহুমুখী চাপ সামলাতে রাজনৈতি দূরদর্শিতা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *