Home » Top 10 » রাজবাড়ির বালিয়াকান্দিতে রমরমা আটকবাণিজ্য

রাজবাড়ির বালিয়াকান্দিতে রমরমা আটকবাণিজ্য

রাজবাড়ির বালিয়াকান্দির পুলিশ সরকারদলীয় এক নেতার যোগসাজশে ঠুনকো অভিযোগে সাধারণ মানুষকে ধরানো-ছাড়ানোর নামে ফ্রি-স্টাইলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর ওই নেতার সহায়তায় পুলিশের আটক বাণিজ্যের কারণে ভুক্তভোগীরা ফুঁসে উঠেছেন। যেকোনো সময় থানার ওসি ও স্থানীয় নেতাকে প্রতিরোধ করা হতে পারে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানিয়েছে। এতে বালিয়াকান্দির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে বলেও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। শুধু তাই নয়, ওই নেতা জহুরুল ইসলামের বড় ভাইও তার নির্যাতনের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমার ভাই আমাদের কথা শোনে না। আপনারা তদন্ত করুন।’

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজবাড়ির বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলামের সহযোগিতায় এলাকার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশ মিথ্যা মামলা ও সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে হামলাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আর থানার ওসির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে জহুরুল ইসলাম বিভিন্ন ব্যক্তিকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এরপর আটক ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আদায়ের পর পুনরায় তাকে ছাড়িয়ে আনছেন। এ অবস্থায় তার দাপটে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া গ্রামের মৃত ইয়াদ আলী মোল্লার ছোট ছেলে জহুরুল ইসলাম। তিনি নারুয়া বাজারে জুয়েলার্সের ব্যবসা শুরু করেন। তার বড় ভাইদের রাজনীতির পরিচয়ে তিনি নারুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি হন। এরপর থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. জিল্লুল হাকিমের আস্থা অর্জন করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বিনা বাধায় সাধারণ সম্পাদক হয়। আর এই পদ পাওয়ার পর থেকেই তিনি বালিয়াকান্দি থানায় দালালির কাজ শুরু করেন। তিনি থানার ভারপ্রপাপ্ত কর্তকর্তার নেকনজর নিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষকে থানা পুলিশে ধরানো, ছাড়ানো, মামলা দায়ের করতে উৎসাহিত করাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন।

আর তার এই অপকর্মের সঙ্গে পাটকিয়াবাড়ীর আরিফুজ্জামান আলেক, বিলমালেঙ্গার রফিকুল ইসলাম বাবলু, কোনাগ্রামের আজিজ মহাজন, চাষী আমজাদ মহাজন, নারুয়ার বাদশা মোল্লাসহ ২০-২৫ জনের একটি সন্ত্রাসী দল গড়ে তোলেন। তার এই সহযোগীদের নিয়ে প্রতিটি গ্রামে মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপকর্ম করে আসছে। তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা মার্কা মনোনয়ন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, তিনি এলাকায় সুদ ও দাদনের ব্যবসা পরিচালনা করেন। নৌকা মার্কায় মনোনয়ন পেয়ে তার সুদের টাকার জন্য নারুয়া মুন্সী ইয়ার উদ্দিন আহম্মেদ বালিকা বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী জয়নুল আবেদীনের উপর নির্যাতন ও চাপ সৃষ্টি শুরু করে। একপর্যায়ে তিনি জমি বিক্রি করে টাকা পরিশোধ করেও তার অব্যাহত চাপের মুখে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান জয়নুল আবেদীন। আর ইউপি নির্বাচনে তার বিরোধিতা করায় লোকমান খানের ছেলে আলেক খানকে নারুয়া বাজার সুইসগেইট থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে নিচে ফেলে দেয়। এতে তিনি কাদা মাটির মধ্যে পড়ে কোনো মতো জীবনে রক্ষা পান।

স্থানীয়রা জানান, নৌকা মার্কায় মনোনয়ন পেলেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুস সালামের নিকট বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন জুহুর। এরপরই তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার পক্ষে নির্বাচন না করায় নারুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক মন্ডলের বিরুদ্ধে রসুন চুরির মিথ্যা হামলাসহ একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি শুরু করে। আবার গড়াই নদীর চরাঞ্চলের জমি দখল করে বিভিন্ন লোকের কাছে বিক্রি করাসহ নিজের নামে স্ট্যাম্প করে নিয়েছেন। তাছাড়া, চর থেকে আজিজ মহাজন ও মোহন লস্করের নেতৃত্বে অবৈধভাবে বালু কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার বিভিন্ন এলাকায় সালিস দরবারের নামে অর্থ আদায় করে থাকে। কেউ সালিস না মানলে থানায় অভিযোগ দিয়ে ডেকে এনে অর্থ আদায়সহ নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

চিহিৃত এই দালালদের মাধ্যমে থানার ওসি মো. জাহিদুল ইসলাম প্রতিদিনই থানায় ৪-৫টি করে সালিসের আয়োজন করেন। সালিসে মোটা অংকের অর্থ না পেলেই রায় যায় উল্টে। ঘিকমলার মফিজ নামের এক ব্যক্তির জমি প্রকাশ্য দিবালোকে দখল করে ঘর উত্তোলন করা হয়। শুধু তাই নয়, উক্ত জমির মালিকের নামে উল্টো থানায় মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।

আর জামসাপুর গ্রামের কাজী বাড়িতে একটি বাল্যবিবাহের ঘটনায় অর্ধলক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ওই বাড়িতে থানার অফিসার ইনচার্জ জাহিদুল ইসলাম কয়েকদফা হানা দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর জহুরুল ইসলাম নিজেই নারুয়া বাজারের মরা চন্দনা নদী ভরাট করে মার্কেট নির্মাণের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এনজিও এহসান এস বাংলাদেশের নারুয়া বাজার শাখার কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লে গ্রাহকদের টাকার দায়িত্ব নেন তিনি। এরপর এনজিওর নামীয় জমি বিক্রি করা হলেও গ্রাহকরা তাদের আমানতের টাকা ফেরত পায়নি।
অপর সূত্র জানায়, সন্ত্রাসী জহিরুল তার গ্রুপের সহযোগিতায় এলাকায় বিভিন্ন মোবাইল প্রতারক চক্র ও গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছেন। তার সহযোগীরা থানার ওসির নাম ব্যবহার করে টাকা আদায় করছে। জহুরুলের সহযোগী বাদশা মোল্লা গড়াই নদী থেকে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার এইচএম রকিব হায়দার ভ্রাম্যমাণ আদালতে ওই ড্রেজারটি অপসারণ করাসহ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। নারুয়া খেয়াঘাট ও সোনাকান্দার খেয়াঘাট ইজারা জহুরুল ইসলামের লোককে পাইয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে। টেন্ডার প্রকাশ্যে করে দেওয়ার ফলে সোনাকান্দর খেয়াঘাটটি তার আস্থাভাজন লোক না পাওয়ায় ক্ষিপ্ত হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর।

পরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান, নারুয়া ইউপি চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা, সোনাকান্দর খেয়াঘাট ইজারাদার রাসেল মোল্লাসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে রাজবাড়ী আদালতে মামলা দায়ের করেন।রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ জিল্লুল হাকিম ও উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ একাধিকবার থানার ওসি মোঃ জাহিদুল ইসলাম ও জহুরুল ইসলামকে একাধিকবার সতর্ক করলেও তাদের অপকর্ম বন্ধ হচ্ছে না। নারুয়া ইউপি চেয়ারম্যান জানান, জহুরুল ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর বেপরোয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ শোনা যায়। তিনি স্থানীয় এমপি সাহেবের আস্থাভাজন।

আর জহুরুল ইসলামের বড় ভাই ওয়াজেদ আলী মোল্লা অভিযোগ অস্বীকার না করে বলেন, আমাদের কথাতো শোনে না। আমার ভাই আমরা আর কি বলবো। আপনারা তদন্ত করুন। নারুয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলামের সেল ফোনে বারবার ফোন করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম আমার সংবাদকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জহুরের মতো ভালো ছেলে হতেই পারে না। তার বিরুদ্ধে যে বা যারা অভিযোগ করেছেন, তা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে জানান তিনি ।

source: www.amar-sangbad.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *