Home » অন্যান্য » নারুয়ায় সন্ত্রাসের রাজত্বে অসহায় সাধারণ মানুষ! : আতংকের নাম জহুরুল

নারুয়ায় সন্ত্রাসের রাজত্বে অসহায় সাধারণ মানুষ! : আতংকের নাম জহুরুল

রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম। নারুয়া ইউনিয়নবাসীর কাছে এই নামটি এখন অনেকটাই আতঙ্কের। জহুরুল তার রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সন্ত্রাসী ও নিজস্ব বাহিনী দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নানা ধরনের অত্যাচার-নিপীড়ন চালায়, গ্রামের নিরীহ মানুষদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জমি-ঘরবাড়ি দখল করে বলে অভিযোগ নারুয়াবাসীর। এসব অপকর্ম ঢাকতে থানা-পুলিশের সঙ্গে তার যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।

সরেজমিনে বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, জহুরুল  তার ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর জন্য চাষি আমজাদ ও আজিজ মহাজনের নেতৃত্বে ২৫/৩০ জনের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন। এসব বাহিনীর মাধ্যমে ইজারা ছাড়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, জমি দখল, অকারণে নির্যাতন, মিথ্যা মামলা দায়ের, নগদ টাকা হাতিয়ে নিতে শালিসের নাটক সাজানো, চাঁদাবাজি, নদীর চরের জায়গা বিক্রি ও মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন তিনি। অত্যাচারের শিকার মানুষজন জহুরুল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে পুলিশের কাছেও কোনও অভিযোগ করতে চায় না।   

তবে নারুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলামের সঙ্গে থানা পুলিশের কোনও ধরনের যোগাযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বালিয়াকান্দি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল ইসলাম।

নারুয়া ইউনিয়নের কোনাগ্রাম ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুরুল ইসলাম জানান, ‘নারুয়া ইউনিয়নের কোনাগ্রামে চাষি আমজাদ, আজিজ মহাজন, মোহন লসকর, রইচ উদ্দিন, বদর মাস্টার ও মনিরুল ইসলাম এলাকায় মদ গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবসা চালায়।

তারা ঈদগাহের জায়গা দখল করে গাছপালা কেটে সেখানে ফসল লাগিয়েছে। এছাড়া নদীর দুটি পয়েন্টে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। এসবের মূল হোতা নারুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম। তার নেতৃত্বে আমজাদ বাহিনী ও আজিজ বাহিনী গড়ে ওঠেছে। এরা কোনাগ্রামেও নানা ধরনের ক্ষতি করছে এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। তারা সাধারণ মানুষকে জামায়াত-শিবির বলে রাতের অন্ধকারে ধরে নিয়ে যায়, পরবর্তীতে কিছু টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। এসব টাকা এই চক্র আর থানা পুলিশ ভাগাভাগি করে নেয়।

তিনি আরও জানান, যারা এসবের প্রতিবাদ করে তাদের বাড়িঘর লুটপাট করে গাছপালা কেটে নেওয়ার  হুমকি দেওয়া হয়।  তার দাবি, এলাকায় যেন এসব কার্যক্রম বন্ধ হয়। মানুষ যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারে। যেসব মানুষের জায়গা জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে তা যেন তারা ফিরে পায়।

জহুরুলের নির্যাতনের শিকার জাকির হোসেন বলেন, ‘মাঠে ফসল (তিল) বুনেছিলাম। জহুরুলের বাহিনীরা জোর করে সব ফসল কেটে নিয়ে গেছে। এর প্রতিবাদ করায় কিছুদিন আগে কোনাগ্রাম প্রাইমারি স্কুলের সামনে যাওয়ার সময় হঠাৎ করে মোহন নামে একজন আমাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে।’

কোনাগ্রামের বৃদ্ধ কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন,‘আমার প্রায় ৫০ শতাংশ জমি মনিরুল বাহিনী জোর করে দখলে নিয়েছে। সেখানে তারা ঘরবাড়ি তুলেছে। আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ দিয়ে হুমকি দিয়েছে। আমার সন্তানরা বাইরে থাকে আর আমি একাই বাড়িতে থাকি। তাই যে কোনও  সময়ে তারা আমার প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। মনিরুল বাহিনী জহুরুলের লোক। তার নির্দেশেই এসব হচ্ছে। আমি এর বিচার চাই।’

নারুয়া ইউনিয়নের মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘নারুয়া ইউনিয়নের গড়াই নদীর তীরে আমার বাড়ি। বাড়ির পাশের জমি থেকে ওরা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে। বাধা দিতে গেলে ওরা আমাকে আর আমার বৃদ্ধ বাবাকে মারধর করেছে। জহুরুল আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি। থানায় গেলে তার নামে মামলা নেয় না। তাই ভয়ে থানায় যেতে পারি না।’

জহুরুল ইসলামজহুরুল ইসলাম

এসব অভিযোগের বিষয়ে নারুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে তার মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে নারুয়া বাজারে জহুরুলের দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে তার একাধিক কর্মীকে দেখা গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও নারুয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা  মো. আব্দুল খালেক মণ্ডল বলেন, ‘গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জহুরুল মনোনয়ন পেলেও মানুষ তাকে গ্রহণ করেননি। বিদ্রোহী প্রার্থী সালাম মাস্টারকে জনগণ ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান বানিয়েছে। এরই জেরে জহুরুল রসুন চুরির উদ্ভট মামলা চাপিয়ে দেয় আমার ও আমার বড় ছেলের ওপর। পরে ওসিকে বলে দিয়ে আমাদের নামে মামলা রেকর্ড করিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জহুরুলের বাহিনী চাষি আমজাদ ও আজিজ মহাজন বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে। সাধারণ মানুষ বড় অসহায়। থানায় জহুরুলের যোগাযোগ আছে।’

মুক্তিযোদ্ধা খালেক বলেন, ‘সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য। আমি আওয়ামী লীগ করি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম। স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের অবদান আছে। আমরাতো  আওয়ামী লীগই করতে চাই। কিন্তু এরা আমাদের তা করতে দিচ্ছে না, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট।’

বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম রকিব হায়দার বলেন, ‘বালিয়াকান্দিতে সরকারিভাবে কোনও বালু মহাল ঘোষণা করা হয়নি বা ইজারা দেওয়া হয়নি। যদি কেউ বালু উত্তোলন করে থাকে তাহলে সেটা অবৈধ। নারুয়া ইউনিয়নের কোনাগ্রাম নামক জায়গায় গড়াই নদীতে বালু উত্তোলনের বিষয়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আমরা ইতোমধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন যদি আবার বালু উত্তোলন হয় তাহলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।’

এ ব্যাপারে বালিয়াকান্দি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহিদুল ইসলাম-পিপিএম জানান, ‘পুলিশ সব সময়ে পুলিশের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে। নারুয়ায় দলীয়ভাবে গ্রুপিংয়ের কারণে এসব অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ তা মিথ্যা ও বানোয়াট। জহুরুলের সঙ্গে পুলিশের কোনও ধরনের যোগাযোগ নেই।’ source: banglatribune.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *