Home » খেলাধুলা » ফুটবলের দলবদল যেভাবে হয়

ফুটবলের দলবদল যেভাবে হয়

ইউরোপিয়ান ফুটবলে জুলাই ও আগস্টকে বলা হয় ‘অর্থহীন মৌসুম’। কেন? বার্সেলোনা থেকে বিশ্বরেকর্ড গড়ে ২২ কোটি ২০ লাখ ইউরোর বিনিময়ে নেইমারের প্যারিস সেইন্ট-জার্মেই (পিএসজি)-এ যাওয়া দেখেও বুঝতে পারছেন না? এই দুই মাসই ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের মৌসুম। এ সময় ফুটবল দলগুলো একে অপরের খেলোয়াড়দের কিনতে পারে। দেখার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ খেলা না থাকায় দর্শকরাও এই সময়টায় দলবদলের বিভিন্ন খবর নিয়ে মেতে থাকে। দারুণ কোনো খেলোয়াড়ের আগমন। কিংবা দল ছেড়ে প্রিয় কারও চলে যাওয়া। এ নিয়েই মূলত আলোচনা চলে ভক্তদের মাঝে। নেইমারের দলবদলে উভয়টিই ঘটেছে।
কাতালোনিয়া থেকে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারকে নিতে কয়েকমাস ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছিল পিএসজি। গত সপ্তাহে নাটক বেশ জমে উঠে। বার্সায় নেইমারের সতীর্থরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলছিলেন, নেইমার থাকবেন বার্সাতেই। কিন্তু পত্রিকাগুলো বলছিল, খুব দ্রুতই পিএসজিতে পাড়ি জমাবেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পত্রিকার খবরই সত্য হলো। ৩রা আগস্ট পিএসজিতে পাড়ি জমান নেইমার। বার্সেলোনা অভিযোগ করেছে, নেইমারকে কেনার অর্থ পিএসজি’র লাভের ঘর থেকে পরিশোধ করা হয়নি। বরং ক্লাবটির কাতারি মালিকরাই পকেট থেকে যুগিয়েছেন কাড়ি কাড়ি অর্থ। এই অভিযোগ সত্যি হলে, এটি দলবদলের নিয়মের লঙ্ঘণ। কারণ, একটি ক্লাব ততটুকুই খরচ করতে পারবে, যতটুকু তাদের আয়। টেলিভিশন রেভিনিউ ও স্পন্সরশিপ চুক্তি থেকে ক্লাবগুলোর আয় বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ট্রান্সফার ফিও। বেশিরভাগ এলিট দলই প্রথমসারির কোনো খেলোয়াড়কে দলে ভেড়াতে ৪ কোটি ইউরো পর্যন্ত খরচ করতে রাজি থাকে। কিন্তু এই চুক্তিগুলো কীভাবে হয়?
আলোচনার টেবিলে যাওয়ার আগে, সঠিক খেলোয়াড়কে টার্গেট করার পেছনে আগ্রহী দলগুলো অনেক সময় ব্যয় করে। প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করতে ক্লাবগুলো সাধারণত অন্যদের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বিশাল ভিডিও লাইব্রেরি কিংবা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স উপাত্তের ভা-ারও থাকে তাদেও কাছে। এসব উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই খেলোয়াড় টার্গেটে মনোযোগী হয় শীর্ষ ক্লাবগুলো। দলের ম্যানেজার সাধারণত এই টার্গেট নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকেন। কিন্তু দর কষাকষির কাজটা করেন হয়তো ‘ফুটবল পরিচালক’ কিংবা কোনো জ্যেষ্ঠ নির্বাহী। যদি টার্গেটে থাকা খেলোয়াড় অন্য কোনো ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ থাকেন, তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা ওই ক্লাবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করবেন। নিয়মানুযায়ী ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগের আগে খেলোয়াড় কিংবা তার এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে না। তবুও কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে কোনো ক্লাবের আগ্রহের কথা যেকোনো এক পক্ষ প্রায়ই গণমাধ্যমের কাছে ফাঁস কওে দেয়।
এরপরে যেই দরকষাকষি হয়, সেটা সাধারণত হয় হোয়্যাটসঅ্যাপে, বলছিলেন খেলাধুলা বিষয়ক আইনজীবী জেক কোহেন। মোবাইল মেসেজিং সার্ভিস হোয়্যাটসঅ্যাপের কিছু বিশেষ ফিচার এক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী। গ্রুপ চ্যাট, ইন্সট্যান্ট আপডেট ও সুরক্ষিত নিরাপত্তা বলয় থাকায় সব পক্ষের জন্য হোয়্যাটসঅ্যাপে আলাপ করা সহজ। একটি দলবদল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে অনেক চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রথম চুক্তিতে থাকে ট্রান্সফার ফি, বা খেলোয়াড়ের বর্তমান ক্লাব কত অর্থ পাবে, সেই হিসাবনিকাশ। যেমন, নেইমারের সঙ্গে বার্সার চুক্তিতে ‘রিলিজ ক্লজ’ ছিল। এই শর্তের আওতায় নেইমারের মালিক হিসেবে বার্সা পাবে ২২ কোটি ২০ লাখ ইউরো। এই অর্থ নিয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছালেই আলোচনা গড়ায় দ্বিতীয় ধাপে। এই পর্যায়ে ক্রেতা ক্লাবটি কথা চালাচালি করে খেলোয়াড়ের এজেন্টের সঙ্গে। এখানে আলোচনা হয় খেলোয়াড় কত পাবেন, তা নিয়ে। যেমন, নেইমারের বেলায় তিনি পিএসজিতে পাবেন বার্ষিক ৩ কোটি ইউরো। তৃতীয় চুক্তিটি হবে ক্রেতা ক্লাবের সঙ্গে এজেন্টের কমিশন নিয়ে। আইনি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ড্রু ম্যাকগ্রেগর অব ব্রাবনার্স জানিয়েছে, সাধারণত ট্রান্সফার ফির ৫-১০ শতাংশ কমিশন পান মধ্যস্থতাকারী এজেন্ট। নেইমারের ক্ষেত্রে তার এজেন্ট বা প্রতিনিধি দল পাবে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ইউরো। এরপর কঠোর স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় খেলোয়াড়কে। বিভিন্ন নথিপত্র দাখিল করতে হয় সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থায়। এরপরই ক্রেতা ক্লাবটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা প্রকাশ করতে পারে।
এতটুকুতেই জটিল লাগছে? তাহলে জেনে রাখুন, কিছু নিয়মকানুন পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল বানিয়ে রেখেছে। যেমন, খেলোয়াড় বেচে দেওয়ার পরও, তিনি যদি ভবিষ্যতে নতুন ক্লাবের হয়ে কোনো ট্রফি জেতেন কিংবা ফের বড় অঙ্কের বিনিময়ে দলবদল করেন, তাহলে বিক্রেতা ক্লাব (নেইমারের বেলায় বার্সা) বাড়তি কিছু অর্থ দাবি করতে পারে। অপরদিকে ক্রেতা দল খেলোয়াড়কে পারফরম্যান্স বোনাস দেবে। এছাড়া তিনি বড় খেলোয়াড় হলে তার ছবি ব্যবহারের জন্যও তাকে মোটা অংকের অর্থ দেবে।
কিন্তু সর্বোপরী ঘুড়ির নাটাই থাকে খেলোয়াড়ের হাতেই। যেমন, বর্তমান ক্লাবের সঙ্গে খেলোয়াড়ের চুক্তি উর্ত্তীর্ণ হয়ে গেলে, কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই তিনি দলত্যাগ করতে পারবেন। তার পুরোনো দলের জন্য এটি বড় ক্ষতি। কিন্তু নতুন দলের জন্য সোনায় সোহাগা। এক্ষেত্রে ট্রান্সফার ফি না থাকায়, খেলোয়াড়ই পান বাড়তি অর্থ। এসব কারণে অনেক খেলোয়াড় নিজের ক্লাবকে রীতিমত জিম্মি করে রাখেন।
(লন্ডনের ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের ‘হাউ অ্যা ফুটবল ট্রান্সফার ওয়ার্কস’ শীর্ষক নিবন্ধের অনুবাদ।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *