Home » Top 10 » অস্ত্রবিরতি শেষ হলেও হামলা চালায়নি আরসা!

অস্ত্রবিরতি শেষ হলেও হামলা চালায়নি আরসা!

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলেছে, গত মঙ্গলবার আরাকান সালভেশন আর্মি আরসা একমাসের অস্ত্র বিরতি শেষ হলেও নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেনি। রয়টার্স এই তথাকথিত অস্ত্রবিরতির খবর বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট করেছে। তারা আরো বলেছে, মিয়ানমারের জনগণ তাদের সামরিক বাহিনীর সহিংস ক্যাম্পেনকে সমর্থন করেন। এটা জনপ্রিয়। একই সঙ্গে তারা বলেছে আগামী ১৬ই অক্টোবর ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বর্মী সামরিক কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
রয়টার্স জানায়, শনিবার বিদ্রোহীরা বলেছে, গত সোমবার মধ্যরাতে অস্ত্র বিরতির সময় পেরিয়ে গেলেও তারা যে কোনো শান্তি উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছে। গত মঙ্গলবার ইয়াঙ্গুনে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র মিং অন রয়টার্সকে বলেছেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে, আরসা আক্রমণ চালাতে পারে। কিন্তু তাদের দিক থেকে কোনো আক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি।
এটা লক্ষণীয় যে, বিদ্রোহীদের সঙ্গে রয়টার্স কিভাবে কথা বলেছে, তার কোনো তথ্য ওই প্রতিবেদনে নেই। অজ্ঞাতনামা আরসা সূত্রের বরাত দিয়ে এই প্রভাবশালী পশ্চিমা  গণমাধ্যমটি বলেছে, গত ২৫শে আগস্ট বর্মী নিরাপত্তা বাহিনীর উপর আক্রমণের পর সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে একটি দানবিক ক্র্যাকডাউন চালিয়েছে।
অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, রয়টার্সের এই রিপোর্টটির লক্ষ্য হচ্ছে, পাঠককে এই ধারণা দেয়া যে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী একটি পক্ষ এবং দুর্বল হলেও রোহিঙ্গাদের দিক থেকে আরও একটি পক্ষ রয়েছে। আর তাদের সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে কোনো ধরনের নির্ভরযোগ্য তথ্য ওই হামলার আগে কোনো মিডিয়াতেই তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি। এমন কি আরসার নামটি পর্যন্ত ২৫শে আগস্টের হামলার পরে জানা গেছে। আর এখন তাদের ক্ষমতা ও সাংগঠনিক শক্তি এতটাই যে, রয়টার্স তার খবরের শিরোনাম করেছে, ‘রোহিঙ্গা ইনসার্জেন্ট সিজফায়ার এন্ডস ইন মিয়ানমার উইথ নো রিপোর্ট অব অ্যাটাক’।
গত ১০ই সেপ্টেম্বর আরসা ঘোষণা দিয়েছে যে, ১০ই সেপ্টেম্বর থেকে তারা অস্ত্র বিরতি কার্যকর করেছে। যাতে করে রাখাইনের ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয়।
রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়, বর্মী সরকার প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজার বেসামরিক রোহিঙ্গা নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। এবং সরকার জাতিগত নির্মূলের অভিযোগ নাকচ করেছে। এখন কর্তৃপক্ষ বিদ্রোহীদের অস্ত্র বিরতির বিষয়ে বলেছে যে, তারা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাবেন না। সংবাদ সংস্থাটি আরও বলেছে, গত আগস্ট থেকে ৫শ’র বেশি লোক নিহত হয়েছে। এদের অধিকাংশ বিদ্রোহী।
এরপর রয়টার্স উল্লেখ করে- ‘এমনকি সরকারের আক্রমণ পরিচালনার আগে ক্ষুদ্র এবং হালকা অস্ত্র সজ্জিত আরসা শুধু নিরাপত্তা চৌকিগুলোর উপরে হামলা চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশল বাস্তবায়ন করত। এবং তাদের পক্ষে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তেমন কোনো টেকসই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া সম্ভব ছিল না।
পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, রয়টার্সের প্রতিবেদনটি এমনভাবে লেখা হয়েছে, যাতে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যেসব নিষ্ঠুরতার অভিযোগ উঠেছে, তার অনুকূলে একটা যুক্তি কিংবা সহানুভূতিসূচক কিছু প্রকাশ পায় । যেমন এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইন সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, রাখাইনের রাজধানী সিটুয়েতে সরকারি সংস্থাগুলোকে কড়া সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল। কারণ অস্ত্র বিরতির মেয়াদ ফুরিয়ে আসার কারণেই তারা হামলার আশঙ্কা করেছিল ।
এই রিপোর্টে বলা হয়, আরসার বিদ্রোহীরা রোহিঙ্গাদের জন্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে। তারা বলেছে, যেহেতু রোহিঙ্গাদের কখনো মিয়ানমারের আদিবাসী সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকার করা হয়নি বরং একটি আইনের অধীনে তাদের জাতিসত্তা, জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদেরকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। জাতিগত রাখাইন বৌদ্ধরা ব্যাপক জনপ্রিয়। তারা রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব দেখিয়ে চলছে।
ইয়াঙ্গুন ডেটলাইনে প্রকাশিত এই খবরে আরো বলা হয়েছে, রাখাইন গ্রামবাসীরা বলেছে, খাদ্য সংকট ঘনিয়ে আসছে। ঘরে ঘরে খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে। কারণ ফসলের ক্ষেত থেকে কোনো ফসল মিলবে না। রাজ্য সরকার গ্রামের বাজার বন্ধ করে দিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, এই বাক্যটি লেখার পরেই এ ধরনের পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘দৃশ্যত খাদ্য পরিবহনে বাধা নিষেধ আরোপ করা হয়েছে যাতে তা জঙ্গিদের কাছে না পৌঁছাতে পারে।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বরাতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী যখন একটি হিংসাত্মক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে তখন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুদের জীবনে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি হুমকি তাড়া করে ফিরছে। আর সেটা হলো অনাহার। এই বাক্যটির পরে রয়টার্স খবর দিয়েছে, ‘রাখাইন ত্যাগ করে পালানোর কারণ হিসেবে খাদ্য সংকটকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও সোমবার রাখাইন রাজ্য সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দুর্ভিক্ষের সম্ভবাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।’
এরপর রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিয়ানমারের সামরিক নেতা, কূটনীতিক  এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপের চিন্তাভাবনা করছে বলে রয়টার্সকে বলা হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পদক্ষেপের বিষয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হলে দেশটির গণতন্ত্রে উত্তরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরারাষ্ট্রমন্ত্রীরা আগামী ১৬ই অক্টোবর মিয়ানমার বিষয়ে আলোচনা করবেন। এবং ইতিমধ্যে তারা একটি খসড়া যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন যে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ এবং অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেবে। এ ধরনের পদক্ষেপ মূলত প্রতীকী হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে আরও পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে।
রয়টার্স জানিয়েছে, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বর্তমানে যে মিলিটারি ক্যাম্পেইন চলছে তা মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জনপ্রিয়। মিয়ানমারের জনগণের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতি রয়েছে।
সর্বশেষ সহিংসতার পরে অং সান সুচির দল প্রথমবারেরর মতো আগামী মঙ্গলবার ইয়াঙ্গুনের একটি স্টেডিয়ামে আন্তঃধর্ম প্রার্থনার আয়োজন করবে। এই সম্মেলনে বৌদ্ধ, মুসলিম হিন্দু ও খ্রিস্টানদের আহ্বান জানানো হয়েছে। এনএলডি’র মুখপাত্র অং শিন রয়টার্সকে বলেছেন, এই প্রার্থনা সম্মেলন শান্তি ও স্থিতির জন্য। রাখাইনের শান্তি এবং সমগ্র দেশের শান্তির জন্য।
এই রিপোর্টের উপসংহারে রয়টার্স উল্লেখ করেছে, সুচির দলের নীতিতে রোহিঙ্গারা একটি পরিবর্তন আশা করছে। কিন্তু বৌদ্ধ জাতিয়তাবাদীরা এতে হতাশ হয়ে পড়বে সেটা ভেবে তারা উদ্বিগ্ন। সুচির দল ২০১৫ সালের নির্বাচনে একজন মুসলিম প্রার্থীও মনোনায়ন দেয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *