Home » শিক্ষা » অন্যান্য » যে শিক্ষক ৩৮ বছর ছুটি নেননি!

যে শিক্ষক ৩৮ বছর ছুটি নেননি!

তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম হয়েছিল ১৯৯২ সালে, জামালপুরের মাদারগঞ্জে। ইচ্ছে হচ্ছিল তখনই ছুটে গিয়ে মেয়ের মুখ দেখতে। টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে জামালপুর খুব দূরের পথ তো নয়। যাবেন কীভাবে, স্কুল যে খোলা! চাইলেই ছুটি নিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু এ শিক্ষক তো তেমন নন। পিতৃত্বের পরম আনন্দ দায়িত্বের কাছে হার মানল। সপ্তাহের ছুটির দিনটিই বেছে নিলেন মেয়েকে দেখার জন্য।

তারপর আরও একদিন। ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে এক শুক্রবারে স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলেন মাদারগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে। পরদিন ভোরে রওনা হতে গিয়ে দেখেন হরতাল। রাস্তায় যানবাহন চলছে না। শ্বশুরবাড়ি থেকে একটি সাইকেল জোগাড় করে স্ত্রীকে নিয়ে রওনা হন। ৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মধুপুরের কাছাকাছি এসে দেখলেন সকাল সাড়ে ১০টা বেজে গেছে। এ গতিতে সাইকেল চালালে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে পারবেন না। তাই স্ত্রীকে পথে নামিয়ে একটি রিকশায় উঠিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। নিজে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে ১১টা বাজার কয়েক মিনিট আগেই ক্লাসে পৌঁছান।

টাঙ্গাইলের মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাহাজ উদ্দিন ফকিরের জীবনের টুকরো গল্প এসব। গল্প নয়, আসলে সত্যি। এই ৩৮ বছরের চাকরিজীবনে এক দিনও তিনি প্রাপ্য ছুটি কাটাননি। আজ বুধবার এ স্কুলে শেষ কার্য দিবস এই শিক্ষকের।

মধুপুর উপজেলার গোপদ গ্রামের এক কৃষক পরিবারে ১৯৫৭ সালে বাহাজ উদ্দিন ফকিরের জন্ম। টানাটানির সংসার, তাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই গৃহশিক্ষকের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে মধুপুর রানি ভবানি হাই স্কুল থেকে এসএসসি, মধুপুর কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ধনবাড়ী কলেজ থেকে স্নাতক (বিএ) পাস করেন। ১৯৭৯ সালের ১ জুন মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দেন বাহাজ উদ্দিন।

৩৮ বছরের চাকরিজীবনে হাসি-কান্নার অনেক ঘটনা ঘটে গেছে বাহাজ উদ্দিনের জীবনে। কিন্তু এসব ঘটনা তাঁকে স্কুলে সময়মতো হাজির হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি জানান, ২০০৩ সালের ২৭ জুন তাঁর বাবা আবদুল হামিদ ফকির মারা যান। সেদিন ছিল শুক্রবার। দাফন সম্পন্ন করে পরদিন স্কুলে সময়মতো হাজির হয়ে পড়েন।

বাহাজ উদ্দিন ফকির জানান, তাঁদের বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূরুর রহমান ’৮৮ সালে শিক্ষকদের জন্য ‘ক্যাজুয়াল লিভ (সিএল) বোনাস’ চালু করেন। যে শিক্ষক-কর্মচারী সারা বছরে এক দিনও অনুপস্থিত থাকবেন না, তাকে এক মাসের বেতন সমপরিমাণ বোনাস দেওয়া হয়। সিএল বোনাস চালুর পর বাহাজ উদ্দিন প্রতিবারও বোনাসটি পেয়েছেন বলে জানান প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ বজলুর রশীদ খান।

বাহাজ উদ্দিন ফকিরের জীবনের এসব ঘটনাকে ‘কিংবদন্তির মতো’ বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা আমাকে আপ্লুত করেছে। তাঁর মতো নিয়মানুবর্তিতার দাবি আমি নিজেও করতে পারি না। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হবে, এ মানুষটিকে অনুসরণ করা।’

মধুপুর উপজেলা সদরে বসবাসকারী বাহাজ উদ্দিনের বড় মেয়ে ঢাকায় দন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞান (বিডিএস) পড়ছেন। ছোট মেয়ে পড়ছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে।

বাহাজ উদ্দিন বলেন, ‘৩৮ বছরে অন্তত ৭৬০ দিন আমার প্রাপ্য ছুটি নিইনি। এই ৭৬০ দিন শিক্ষার্থীদের বেশি পড়াতে পেরেছি। দীর্ঘ চাকরিজীবনে এটাই আমার আনন্দ।’

শহীদ স্মৃতি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ বজলুর রশীদ খান জানান, বাহাজ উদ্দিনের এই নিয়মানুবর্তিতা দেখে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ খুশি। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাহাজ উদ্দিনকে দুই বছর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *