গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যে বিধ্বংসী অভিযান চলছে, তার নেপথ্যে কেবল শাসন পরিবর্তন নয় বরং তেহরানের পরমাণু কর্মসূচিকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক গভীর পরিকল্পনা কাজ করছে।
যুদ্ধের এই পর্যায়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের সেই রহস্যময় ৪৪০ কেজি উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো কোনো বিশেষ কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে এই ইউরেনিয়াম জব্দ করে যুদ্ধের ইতি টানতে চাইছেন। তবে মাটির গভীরে সুরক্ষিত এই পরমাণু ভাণ্ডার উদ্ধার করা কিংবা ধ্বংস করা যে কোনো সহজ কাজ নয়, তা রণক্ষেত্রের পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
গত বছরের জুন মাসে নাতাঞ্জ, ইসফাহান এবং ফোরদোর মতো স্পর্শকাতর পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে ইসরায়েলি হামলার পর থেকেই ইরানের প্রকৃত পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছিল, ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০.৯ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি যদি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা যায়, তবে তা দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।
সম্প্রতি মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের দানবীয় ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা বর্ষণ করেছে, যা মাটির ২০০ ফুট গভীর পর্যন্ত কংক্রিট ভেদ করতে সক্ষম। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, এই হামলায় তালেঘান-২ নামক একটি গোপন স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তাদের জ্বালানি বা পরমাণু স্থাপনায় বড় কোনো আঘাত আসলে তারা পুরো অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো জ্বালিয়ে দেবে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়, যা বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বর্তমান এই অস্থির পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে যে তাদের হামলায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পঙ্গু হয়ে গেছে, অন্যদিকে আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি সতর্ক করেছেন যে, ইরানের কারিগরি এবং শিল্প সক্ষমতা এতটাই উন্নত যে তারা চাইলে খুব দ্রুতই তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠন করতে পারবে।
পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইরান কয়েক বছর ধরে মাটির অনেক গভীরে তাদের ল্যাবরেটরি ও গুদামগুলো সরিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে নাতাঞ্জ কমপ্লেক্সের কাছে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ বা কুহ-ই কোলং গাজ লা নামক পাহাড়ি এলাকায় ইরান এমন এক স্থাপনা তৈরি করছে যা বর্তমান বিশ্বের যে কোনো প্রচলিত বোমার নাগালের বাইরে। ফোরদোর তুলনায় এই স্থাপনাটি কয়েকশ মিটার বেশি গভীর এবং এর প্রবেশপথগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত। সামরিক বিশ্লেষক এয়ার মার্শাল অনিল চোপড়া মনে করেন, কেবল আকাশপথে বোমা বর্ষণ করে ইরানের এই পরমাণু আকাঙ্ক্ষা দমন করা সম্ভব নয়। কারণ বাঙ্কার বাস্টার বোমাও এত গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না যেখানে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম মজুত করে রেখেছে বলে ধারণা করা হয়।
এই সংকটের একটি বিপজ্জনক দিক হলো ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। যদি চলমান যুদ্ধের কারণে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বা চরম অরাজকতা তৈরি হয়, তবে এই বিপজ্জনক ইউরেনিয়াম ভাণ্ডার উগ্রপন্থী বা অন্য কোনো অরাষ্ট্রীয় শক্তির হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এমনটা ঘটলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয় বরং ইউরোপ ও আমেরিকার নিরাপত্তার জন্যও চরম হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই ওয়াশিংটন এখন বিকল্প পথ হিসেবে ‘স্পেশাল অপারেশন’ বা কমান্ডো অভিযানের কথা ভাবছে। অতীতে সিরিয়ার মাসইয়াফে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস করতে ইসরায়েলি কমান্ডোরা যেভাবে সফল অভিযান চালিয়েছিল, সেই আদলে ইরানের পরমাণু স্থাপনার ভেতরে ঢুকে সরাসরি ইউরেনিয়াম কব্জা করার পরিকল্পনা টেবিলে থাকতে পারে।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও পশ্চিমাদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের হাতে এখন এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। খোররামশহর-৪ বা সেজ্জিল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনায়াসেই পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করতে পারে এবং এগুলোর আওতায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বড় একটি অংশ রয়েছে। এমনকি সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোতেও আঘাত হানার সক্ষমতা ইরান অর্জন করেছে বলে অনেক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মনে করছেন। ফলে পরমাণু অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের এই মেলবন্ধন রুখতে যুক্তরাষ্ট্রকে চরম সামরিক ঝুঁকির পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবেই ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচিকে জাতীয় গর্ব এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখে আসছে। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে নানা বাধা ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা এই প্রযুক্তি এগিয়ে নিয়ে গেছে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতে তেহরান তাদের কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হলেও ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর তারা আবারও পুরোদমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে। বর্তমানে ইরান এনপিটি বা পরমাণু অপ্রসারন চুক্তির তোয়াক্কা না করে আইএইএ-র পরিদর্শকদের কাজ সীমিত করে দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টে এমন আইনও পাস করা হয়েছে যা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা নিষিদ্ধ করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সূত্র: ইউরো এশিয়ান টাইমস
