News Times BD

ক্যান্সার চিকিৎসায় লাগবে না কেমো, স্মার্ট ওষুধ আবিষ্কারের ঘোষণা

কান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইঙ্গিত দিয়েছেন গবেষকরা। তারা জানিয়েছেন, নতুন গবেষণা অনুযায়ী- কেমোথেরাপি ছাড়াই স্মার্ট ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যান্সার সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি (এএসসিও)-তে এ কথা জানানো হয়।

সম্মেলনে ক্যান্সার চিকিৎসায় একাধিক যুগান্তকারী অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও গবেষকেরা। প্রায় ৪০ হাজার বিশেষজ্ঞের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে নতুন ওষুধ, উন্নত থেরাপি এবং জীবনধারাভিত্তিক চিকিৎসা নিয়ে দুই হাজার ৭০০-এর বেশি গবেষণা উপস্থাপন করা হয়।

সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল- “চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও প্রয়োগ: বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার চিকিৎসার ফলাফল উন্নয়ন।”

সম্মেলনে উপস্থাপিত পাঁচটি প্রধান অগ্রগতি তুলে ধরা হলো-

১. ‘অদৃশ্য ঢাল’ ভেঙে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসে স্মার্ট ওষুধ
গবেষকেরা এমন একটি ট্যাবলেট তৈরি করেছেন, যা ক্যান্সার কোষের নিজেকে লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে রোগীর নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) টিউমারকে শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে।

পরীক্ষামূলক এই ওষুধের নাম ‘জিআরডব্লিউডি৫৭৬৯’। এটি ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে ব্যবহারে ছয় ধরনের সাধারণ ক্যান্সারে টিউমার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত করেছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, ৮৩ জন রোগীর মধ্যে ২৬ জনের টিউমার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ১৫ জনের ক্ষেত্রে এই কমার হার ছিল ৩০ শতাংশের বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওষুধ ক্যান্সার কোষের ‘ইনভিজিবিলিটি ক্লোক’ বা অদৃশ্য হওয়ার ক্ষমতা ভেঙে দেয়।

২. প্রাণঘাতী প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারে দ্বিগুণ বেঁচে থাকার সময়
বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক ক্যান্সারগুলোর একটি-প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার- চিকিৎসায় বড় সাফল্যের খবর পাওয়া গেছে।

একটি নতুন দৈনিক পিল ‘দারাক্সনরাসিব’ রোগীদের গড় বেঁচে থাকার সময় প্রায় দ্বিগুণ করেছে।

৫০০ রোগীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, নতুন এই ওষুধ গ্রহণকারীরা গড়ে ১৩ দশমিক ২ মাস বেঁচে ছিলেন, যেখানে প্রচলিত কেমোথেরাপিতে এই সময় ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬ থেকে ৬ দশমিক ৭ মাস।

বিশেষজ্ঞরা একে ‘গেমচেঞ্জিং অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

৩. অনেক ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ছাড়াই চিকিৎসা সম্ভব
সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল- কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ছাড়াই নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব হওয়া।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নেতৃত্বে পরিচালিত অপটিমা ট্রায়ালে চার হাজার স্তন ক্যান্সার রোগীকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। জিনগত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়, কোন রোগীরা কেমোথেরাপি ছাড়াই শুধুমাত্র হরমোন থেরাপিতে সুস্থ থাকতে পারবেন।

ফলাফল অনুযায়ী, নিম্ন ঝুঁকির রোগীরা কেমো ছাড়াই নিরাপদে চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পেরেছেন।

এছাড়া ব্লাডার ক্যান্সারে নতুন একটি ইমিউনোথেরাপি ওষুধ কেমো ও রেডিওথেরাপির সঙ্গে ব্যবহার করে অনেক রোগীর অস্ত্রোপচার এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

৪. ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সংকটের আশঙ্কা
অগ্রগতির পাশাপাশি সতর্কবার্তাও এসেছে সম্মেলনে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দ্রুত বর্ধনশীল ও বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে বিশ্বজুড়ে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়ছে।
একটি বড় গবেষণায় বলা হয়—
•    ২০২৫ সালে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ক্যান্সার রোগী ছিল ১৬৫ জন 
•    ২০৫০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ২০০ জনে 
সারাবিশ্বে বর্তমানে বছরে প্রায় ২ কোটি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে সাড়ে তিন কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তখন প্রতিদিন প্রায় এক লাখ মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে।

৫. জীবনধারা পরিবর্তনে ক্যান্সার ঝুঁকি কমানো সম্ভব
গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

দুটি বড় গবেষণায় বলা হয়, অনিয়মিত ঘুম ও খারাপ ঘুমের অভ্যাস তরুণদের মধ্যে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশ্বব্যাপী ১৮-৫০ বছর বয়সীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনিদ্রা বা খারাপ ঘুমের সঙ্গে স্তন, ডিম্বাশয়, অন্ত্র ও জরায়ুর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।

কিছু ক্ষেত্রে অনিদ্রায় আক্রান্ত তরুণদের পাঁচ বছরের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তিনগুণ পর্যন্ত বেশি দেখা গেছে।

এছাড়া যোগব্যায়াম ক্যান্সার রোগীদের উদ্বেগ, ক্লান্তি ও অনিদ্রা কমাতে কার্যকর বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

সুতরাং বলা যায়, আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি-২০২৬ সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাগুলো ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যেমন উন্নত ওষুধ রোগীদের বাঁচার সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তে থাকা রোগীর সংখ্যা বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে ক্যান্সার মোকাবিলায় তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে- উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, দ্রুত শনাক্তকরণ, এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Exit mobile version