তেহরানে সম্প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ বিমান হামলার পর বিশ্ব রাজনীতি নতুন ও কঠিন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভালদাই ক্লাবের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ইভান তিমোফিভ এই ঘটনাপ্রবাহকে রাশিয়ার জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, ইরানের ওপর এই আক্রমণ এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এই সংকটের প্রেক্ষাপটে মস্কোর জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে যা ভবিষ্যতে রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে নিষেধাজ্ঞা কখনোই শেষ ধাপ নয় বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র। ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সামরিক হামলায় রূপ নিয়েছে। ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই ছক অনুসরণ করা হয়েছে যেখানে প্রথমে অর্থনৈতিক অবরোধ এবং পরবর্তীতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করা হয়। রাশিয়ার ক্ষেত্রে পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে সরাসরি ন্যাটো অভিযান কিছুটা থমকে থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সেই চাপ বজায় রাখা হচ্ছে।
ইরানের ওপর চলমান এই প্রবল চাপ প্রমাণ করে যে পশ্চিমা দেশগুলোর কৌশল মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মতো। এটি কোনো স্বল্পমেয়াদী সংঘাত নয় বরং কয়েক দশক ধরে একটি রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা। রাশিয়ার নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে মস্কোর ওপর আরোপিত বর্তমান বিধিনিষেধগুলো খুব দ্রুত তুলে নেওয়া হবে না। এমনকি কোনো পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি আসলেও তা হতে পারে সাময়িক এবং রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা প্রযুক্তিগত অবরোধগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকতে পারে।
ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার অতীত চুক্তিগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে রাশিয়া এখন তার কূটনৈতিক অবস্থানে বেশ অনমনীয়। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতে ইরান ছাড় দিলেও যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে তা থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে আসে যা তেহরানের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষতি ডেকে আনে। এই অভিজ্ঞতা রাশিয়ার সামনে এটিই স্পষ্ট করেছে যে একতরফা ছাড় বা আপস কখনোই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। ফলে ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কো এখন যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার সতর্কতা এবং অবিশ্বাসের অবস্থান বজায় রাখছে।
আধুনিক যুদ্ধের ধরনে এখন আরেকটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে আর তা হলো সরাসরি জাতীয় নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানা। অতীতে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ যুদ্ধের প্রয়োজন হতো কিন্তু বর্তমানে শীর্ষ নেতাদের টার্গেট করে হত্যা করাকে একটি কৌশল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের পর রাশিয়া এখন নিজের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ। এটি এখন কেবল গোয়েন্দা তৎপরতার বিষয় নয় বরং আকাশ প্রতিরক্ষা এবং সামগ্রিক সামরিক ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য বাহ্যিক আক্রমণের চেয়েও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিমোফিভ। ইরানের সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভ এবং অর্থনৈতিক সংকটকে পশ্চিমা শক্তিগুলো দেশটির দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং একে কাজে লাগিয়ে সামরিক চাপ বৃদ্ধি করেছে। রাশিয়ার জন্য এখানে বড় শিক্ষা হলো অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা, জনগণের সাথে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কার্যকর সংস্কারই পারে বাহ্যিক যেকোনো ষড়যন্ত্র বা উসকানির বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করতে।
অর্থনৈতিক অংশীদার বা তথাকথিত ‘ব্ল্যাক নাইট’ দেশগুলোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও রাশিয়াকে সচেতন থাকতে হবে। ইরান তার তেলের বাজার ধরে রাখতে চীন বা ভারতের মতো দেশগুলোর সহায়তা পেলেও সামরিক সংকটের সময় এই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না এটাই স্বাভাবিক। রাশিয়া যদিও তার বাণিজ্য এখন এশিয়ার দেশগুলোর দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে কিন্তু অর্থনৈতিক সহযোগিতা কখনোই সামরিক প্রতিরক্ষা গ্যারান্টির বিকল্প হতে পারে না। উত্তর কোরিয়ার মতো কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মস্কোকে মূলত নিজের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরই পূর্ণ নির্ভরতা বজায় রাখতে হবে।
সূত্র: আরটির নিবন্ধ
