এইচ এম সাইফ আলী খান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত দুই মাস কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল দেড় দশকের অন্ধকারাচ্ছন্ন ও রক্তস্নাত শাসনকাল পেরিয়ে এক নতুন ভোরের সূচনা। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র ৬০ দিনে যে ৬০টি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা রাষ্ট্র সংস্কার এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সম্ভাবনার পথে হাঁটছে, যা দেশি-বিদেশি মহলে কেবল প্রশংসিতই হয়নি, বরং বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার রাষ্ট্র পরিচালনার পথক্রম স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।
এই রূপান্তরের যাত্রায় সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন সংস্কৃতির সূচনা। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কাজের খতিয়ান নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আমাদের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করছে। সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো নিরলস প্রচেষ্টাকে জনগণের সামনে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক সত্য প্রতিষ্ঠা করা।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এনে বিরোধী শক্তিগুলোর প্রতি হট্টগোল ও গুজব পরিহার করে দেশের স্বার্থে গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে। শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই নয়, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্ব আজ বিশ্ব দরবারেও স্বীকৃত; বিশ্বখ্যাত সাময়িকী ‘টাইম’-এর প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় তাঁর স্থান পাওয়া মূলত বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ সংগ্রামেরই এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
সরকারের গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপের অগ্রাধিকারে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন। নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নামক পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। একই সাথে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধাবোধ রক্ষায় দেশের সকল মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার যাজক ও অধ্যক্ষদের জন্য সরকারি সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা সরকার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করছে।
কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের উদ্যোগগুলোও সমভাবে বৈপ্লবিক। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ডের’ মাধ্যমে ১০টি বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে, যা প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ২২ হাজার কৃষককে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের দুর্দশা লাঘবে প্রায় ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। সবুজায়ন ত্বরান্বিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক বিশাল কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ ১৬টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশকে বিশদভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর সংসদে বিল আকারে পেশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও বিশাল ভর্তুকি প্রদান ও কূটনৈতিক দক্ষতার মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে জাতীয় গ্রিডে ইতিমধ্যে ৩৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও জনকল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে পবিত্র রমজান মাসসহ সারা বছর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর বাজার তদারকি এবং খাদ্যপণ্যের নিরবচ্ছিন্ন আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপের সাতটি দেশের সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার তৈরির লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং সাধারণ হাজিদের সুবিধার্থে হজযাত্রার খরচ টিকিটপ্রতি ১২ হাজার টাকা করে কমানো হয়েছে।
দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির জন্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো প্রণয়ন করা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের পুরনো বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবীদের বিকাশে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি শূন্য পদসমূহ দ্রুত পূরণের লক্ষ্যে ৬ মাস, ১ বছর ও ৫ বছর মেয়াদি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় মিতব্যয়িতার মাধ্যমেও প্রধানমন্ত্রী এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘যমুনা’ ব্যবহার না করে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন এবং ভিভিআইপি প্রটোকল উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করেছেন। তাঁর নির্দেশনায় মন্ত্রীরা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট গ্রহণ না করার মতো প্রশংসনীয় সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন।
অবকাঠামো ও স্বাস্থ্য রক্ষায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া, ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নদী দখল ও দূষণ রোধে আইন কঠোরভাবে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে পাচারকৃত সম্পদ শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠনের প্রথম ৬০ দিনের এই পথচলা প্রমাণ করে যে, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে, যা জনগণের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
######
লেখক- এইচ এম সাইফআলী খান
কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক
যোগাযোগ : ০১৭১৩-৩৯২৯৬৯.
