শতাধিক গুম-খুনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলকে এ কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

এদিন জিয়াউলের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও তার বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার। তারা প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগের বিরোধিতা করে অব্যাহতির আবেদন করেন তারা। একইসাথে জিয়াউলের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন কোনো তথ্যপ্রমাণ আনতে পারেনি বলেও দাবি তাদের।

জবাবে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জিয়াউলের ব্যাপারে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভুঁইয়া (আইকেবি) ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি এই মামলায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দেবেন।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তার কাছে আইকেবি জিয়াউলের ব্যাপারে বলেছেন। ২০১২ সালে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পরই জেনারেল আইকেবি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন, তিনি র‌্যাব থেকে সেনা সদস্যদের প্রত্যাহার করে নিতে চান। পুলিশের সঙ্গে মিশে কাজ করতে গিয়ে সেনা অফিসাররা নৈতিক বিচ্যুতির শিকার হচ্ছেন। শেখ হাসিনাও সম্মতিসূচক ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, র‌্যাব জাতীয় রক্ষী বাহিনীর চেয়েও খারাপ। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির পরিবর্তন আসেনি। আইকেবি আরো জানান, তিনি জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ‘ক্রসফায়ার’ বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। ঢাকা সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জিয়াউলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন তিনি। জিয়াউলের আচরণ আরো উচ্ছৃঙ্খল হলে তাকে বোঝানোর দায়িত্ব দেয়া হয় উচ্চপদস্থ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে। কিন্তু পরে ওই সেনা কর্মকর্তারা জানান, তাঁর (জিয়াউলের) মস্তিষ্ক পাথর বা ইটের টুকরা দিয়ে ঠাসা, বোঝানোর কোনো উপায় নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, প্রধানমন্ত্রীর মিলিটারি সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ড মিলিটারি সেক্রেটারির সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতার সুযোগে জিয়াউল আহসান আমার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করেন।’

ঢাকা সেনানিবাসের একাংশে অবাঞ্ছিত ছিলেন জিয়াউল আহসান

জবানবন্দিতে আইকেবি আরও বলেন, ‘জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি। একপর্যায়ে, নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী, এমএসপিএম (প্রধানমন্ত্রীর মিলিটারি সেক্রেটারি) আর তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের ঘনিষ্ঠতার সুবাদে কর্নেল জিয়া আমার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করেন। আমার আর কোনো উপায় ছিল না। আমি তাকে রেললাইনের পশ্চিম পাশের ক্যান্টনমেন্টে পারসোনা নন গ্রাটা’ (পিএনজি) বা অবাঞ্ছিত ঘোষণা করি। তবে পূর্ব পাশের আবাসনটিতে উনাকে থাকতে দিয়েছিলাম। লজিস্টিকস এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বলি। যার ফলস্বরূপ আগে জানানো হয়নি বলে তাকেও নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিরাগভাজন হতে হয়েছিল।
কর্নেল জিয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব তখনই পুরোপুরি বুঝলেন, যখন মিলিটারি পুলিশ তাকে ও তার স্ত্রীকে সেনানিবাসের ভেতরে সিএমএইচে যাওয়ার পথে চেকপোস্টে আটকে দেয়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এমএসপিএম আমাকে ফোন করে জানতে চাইলেন, একজন চাকরিরত অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে পড়ে কি না, না এটা বিশেষ কোনো পদক্ষেপ। আমি বললাম, এটা ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। যদি তুমিও চিফের আদেশ অমান্য করো, তাহলে তোমাকেও একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। পরের দিন তিনি আবার ফোন করে জিয়ার ওপর থেকে এই বিধি তুলে নেওয়ার অনুরোধ করলেন। এ ঘটনার পর কর্নেল জিয়া কিছুটা নিয়মের মধ্যে আসেন। বুঝতে পারেন তিনি এখনো সেনাবাহিনীর অধীনে আছেন। তবু আমি তাকে আমার অফিসে ঢুকতে দিইনি। কারণ জানতাম, তিনি শুধু এসে নিজের কাজের সপক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে আমার সময় নষ্ট করবেন।’

উল্লেখ, শতাধিক গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দেয়া দুজনের সাক্ষ্য আজ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর। আগামীতে এ মামলায় সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেও জানান তাজুল ইসলাম। এ ছাড়া আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রার্থনা করেন তিনি। পরে আদেশের জন্য ১৪ই জানুয়ারি ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here