News Times BD

গোপনে ইরান থেকে তেল আমদানি, এখন বিপাকে মিয়ানমার

নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে গোপনে ইরান থেকে তিন দফায় জেট জ্বালানি আমদানি করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। 

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেষজ্ঞ ও বন্দরসংক্রান্ত নথির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরের শুরু থেকে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এই জ্বালানি আমদানি করে।

জ্বালানি খাতের এক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধে যে হারে এই জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে, তাতে সামরিক বাহিনীর কাছে তাদের অভিযান চালানোর জন্য প্রায় ১২০ থেকে ১৫০ দিনের মতো মজুত আছে। তবে ইরানে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায়, আকাশচুম্বী দামের মধ্যে এখন মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে।

ওই সূত্র আরও জানায়, তিনটি চালানই ইয়াঙ্গুনের কাছে থিলাওয়া বন্দরে অবস্থিত মিয়ান অয়েল টার্মিনালে গেছে। এই স্থাপনাটি আগে পুমা নামে পরিচিত ছিল এবং এটি জেট জ্বালানি সংরক্ষণের একটি কেন্দ্র। যে বন্দর নথি পাওয়া গেছে, তাতে দেখা গেছে, এমভি রিফ নামের সরবরাহকারী জাহাজটি ভান করেছিল যে, এই জ্বালানির উৎস হলো ইরাক। রিফ তুলনামূলক ছোট একটি জাহাজ, যা ইয়াঙ্গুন নদীর অগভীর ও কাদাময় পানিপথের জন্য উপযোগী। এটি ১৮,৩৭৬ টন জ্বালানি বহন করতে পারে। অর্থাৎ এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ব্যারেল।

ওই সূত্রটি বলেছেন, তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ (জেট জ্বালানি) আমদানি করেছে। তারা এ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিল। 

স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সাবেক উপদেষ্টা ও অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ শন টারনেল বলেন, ইরান থেকে মিয়ানমারে জ্বালানি সরবরাহ বাস্তব ছিল এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুরুতে আমি সন্দিহান ছিলাম, কিন্তু পরে নিশ্চিত হয়েছি।

২০২১ সাল থেকে ইরান মিয়ানমারকে সামরিক ড্রোনও সরবরাহ করে আসছে। এছাড়া গত তিন বছরে তারা ইউরিয়াও দিয়েছে, যা দেশে বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। গত জানুয়ারির শেষ দিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, দুই বাণিজ্য বিশ্লেষকের হিসাবে বছরে ইউরিয়া সরবরাহের পরিমাণ ৪ লাখ থেকে ৬ লাখ টনের মধ্যে।

মিয়ানমারের সঙ্গে ইরানের জেট জ্বালানি, ড্রোন এবং ইউরিয়া বাণিজ্য তেহরানের একসময়কার ঘোষিত নীতির বড় ধরনের বিচ্যুতি।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা দখল করেন, যার ফলে দেশের অর্থনীতি ভয়াবহভাবে নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। দেশটিতে কার্যত কোনও উল্লেখযোগ্য পেট্রোকেমিক্যাল পরিশোধন সক্ষমতা নেই এবং তারা তাদের ডিজেল ও পেট্রলের প্রায় ৭০ শতাংশ সিঙ্গাপুর থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারদরের ধাক্কা থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগও খুব কম।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান আক্রমণের পরপরই মিয়ানমারে পেট্রলের দাম ৮০ কিয়াত (০.০৩৮ ডলার) বেড়ে যায় এবং সামনে তা আরও অনেক বাড়তে পারে। শন টারনেল বলেন, জান্তার আর্থিক অবস্থা, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার দিক থেকে, সব সময়ের মতোই টানটান অবস্থায় আছে। ইরানি রফতানি বাজার থেকে বাদ পড়ে গেলে জ্বালানির দামে যে ধরনের বৃদ্ধি হতে পারে, তাতে তাদের চলতি হিসাবের যে উদ্বৃত্ত দিয়ে তারা এখন রাশিয়া থেকে গোলাবারুদ ও আকাশপথের অস্ত্র কিনছে, সেটাও শেষ হয়ে যেতে পারে। আর অবশ্যই, তাদের আরেকজন মিত্র ও সরবরাহকারীও হারিয়ে গেল।

হরমুজ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় মিয়ানমারের সামরিক সরকার ৭ মার্চ থেকে জ্বালানি রেশনিং ঘোষণা করে। এতে জোড় ও বিজোড় নম্বরপ্লেটের যানবাহনকে জোড়-বিজোড় দিনে চলার নিয়ম করা হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও জ্বালানি মজুত করে রাখাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার তাদের জ্বালানি মজুতের তথ্য প্রকাশ করেনি। ২০১৯ সালে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, সাধারণত পেট্রলের মজুত ৩৬ দিন, ডিজেলের ৩৫ দিন এবং জেট জ্বালানির ১২০ দিনের সমান থাকত। শিল্পখাতের ওই পর্যবেক্ষক মনে করেন, পেট্রল ও ডিজেলের মজুত এখন প্রায় ৩০ দিনে নেমে এসেছে।

বড় জনবহুল এলাকাগুলোতে প্রায়ই পাম্প শুকিয়ে যায়। কিন্তু সামরিক বাহিনী সব সময় নিশ্চিত করে যে, যা-ই পাওয়া যাক, সবার আগে তারা সেটাই পাবে। তবু ইরান সংকট তাদের আর্থিকভাবে চাপে ফেলবে। বিশেষ করে থাইল্যান্ড ও চীনে প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ করে কমে গেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি বলেন, জান্তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কম থাকায়, বৈশ্বিক তেলের দামে যেকোনও দীর্ঘস্থায়ী উল্লম্ফন নেপিদোর আর্থিক অবস্থা এবং বৃহত্তর অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেন, অতীতে এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কার একটি অংশ প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে বেশি আয়ের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু এখন গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেই সুরক্ষা অনেক ছোট হয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে সাধারণ মানুষের ওপর, যারা আগেই জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছে। তারা পরিবহন, খাদ্য, ভোগ্যপণ্য এবং জ্বালানির আরও উচ্চ দামের মুখে পড়বে।

২০০৭ সালে জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহারের ফলে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়। যা তথাকথিত স্যাফরন রেভ্যুলুশন উসকে দেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এটি ছিল মূলত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে একটি বড় কিন্তু ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থান।

মিয়ানমারের সঙ্গে ২৪০০ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে জ্বালানি রফতানি বন্ধের থাইল্যান্ডের সিদ্ধান্তের ফলে গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের মায়ে সাই জেলা, মিয়ানমারের তাচিলেইক প্রদেশ এবং মায়ে সট-মিয়াওয়াদি সীমান্ত এলাকায় আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা শুরু হয়। সূত্র: নিক্কেই এশিয়া

Exit mobile version