দেশে তিন মৌসুমেই আমন, বোরো ও আউশের বাম্পার ফলন হয়েছে। সরকারি গুদামে রয়েছে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্যের মজুত। চাল আমদানির জাহাজও থেমে নেই। তবু বাজারে চালের দামে আগুন। এক মাসের ব্যবধানে সাধারণ মানের চাল কেজিতে তিন-পাঁচ টাকা বেড়েছে। আর সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের দাম যেন লাফিয়ে বেড়েছে কেজিতে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা পর্যন্ত।

রাজধানীর শ্যামবাজার, বাবুবাজার ও কারওয়ান বাজারের পাইকারি আড়তে চালের ৫০ কেজির বস্তায় ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে খুচরা দোকানে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মধ্য ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো। তাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকার বড় অংশই চালনির্ভর।

 

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরায় মোটা স্বর্ণা চাল এখন কেজি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রি-২৯ ও ব্রি-২৮ চাল ৬০-৬৫ টাকার মধ্যে। মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট কেজিতে তিন-চার টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮-৯০ টাকায়। নাজিরশাইলও খুচরায় ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে এখন খোলা সুগন্ধি চিনিগুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫৫-১৬০ টাকায়। প্যাকেটজাত ‘চাষি’ ব্র্যান্ডের সুগন্ধি চিনিগুঁড়া ১৭০-১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী মো. মাসুদ বলেন, রমজান ঘিরে সাধারণত বিক্রি কিছুটা কম থাকে। সেদ্ধ চালের দামে বড় পরিবর্তন না এলেও সুগন্ধি চালের বাজার অস্থির। আগে যে মানের চিনিগুঁড়া ১০৫ টাকায় কিনতেন, এখন তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ১৪০ টাকায়। তার ভাষায়, রপ্তানির কারণে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে বলেই দাম চড়া। কারওয়ান বাজারের ইফতি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জামিল আহমেদ জানান, সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই বাজারে দাম কিছুটা উঁচুতে রয়েছে। পাইকারিতে ৫০ কেজির বস্তায় ১৫০-১৭৫ টাকা বেড়েছে বিভিন্ন চালের দাম। শম্পা কাটারি ও নাজিরশাইলের মতো মৌসুমি জাতেও বস্তাপ্রতি ১২০-১৭০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা বিক্রিতে দাম না বাড়িয়ে উপায় থাকে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৫৭ লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ মেট্রিক টন। বহু জেলায় লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ফলন মিলেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক তথ্য বলছে, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন গত বছরের ২ দশমিক ৮১ টন থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৯৫ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৪০ কেজির বেশি অতিরিক্ত ধান উৎপাদন হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আমন মৌসুমে সরকার ১০ লাখ ৫ হাজার টন ধান ও চাল সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে সরকারি গুদামে মজুত খাদ্যশস্যের পরিমাণ ২১ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি। অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়াতে আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৯ লাখ টন চাল আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে এসেছে ৮ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বাইরে ভারত থেকে আরও ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, উৎপাদন, মজুত ও আমদানি-তিন দিক থেকেই অবস্থান শক্ত। তবু খোলা বাজারে দামের এই ঊর্ধ্বগতি ভোক্তাদের ভাবাচ্ছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রেকর্ড ফলন ও পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও দাম বাড়া স্বাভাবিক নয়। মিলগেট থেকে পাইকারি বাজার পর্যন্ত নজরদারি দুর্বল থাকলে কিছু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নেন। কার্যকর তদারকি না থাকলে বাজারে অস্থিরতা কাটানো কঠিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here