News Times BD

জাইমা রহমান রাজনীতিতে নতুন কণ্ঠ, নতুন বার্তা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কেবল কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি নয়—একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। রোববার বিকেলে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে তেমনই এক মুহূর্তের সাক্ষী হলো রাজনৈতিক অঙ্গন। আলোচনার বিষয় ছিল ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে এসে দাঁড়ালেন এক নতুন কণ্ঠ—ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

তিনি কোনো স্লোগান দিলেন না, কোনো রাজনৈতিক আক্রমণ করলেন না, ক্ষমতার ভাষায় কথা বললেন না। বরং খুব সংযত, মার্জিত এবং আত্মসমালোচনামূলক উচ্চারণে তিনি এমন কিছু প্রশ্ন ও উপলব্ধির কথা বললেন, যা রাজনীতির দীর্ঘদিনের ক্লান্ত শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে গেল। এটিই ছিল বাংলাদেশের কোনো নীতি-পর্যায়ের আলোচনায় তার প্রথম বক্তব্য। অথচ সেই প্রথম বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠল—তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের উত্তরাধিকার নন, বরং সময়কে বোঝার চেষ্টা করা এক সচেতন নাগরিক।

 

প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে—এই পরিচয়গুলো তাকে ঘিরে থাকলেও, বক্তব্যের প্রতিটি বাক্যে তিনি নিজেকে পরিচিত করালেন ভিন্নভাবে। বললেন, “আমি এমন কেউ নই, যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে বা সব সমস্যার সমাধান জানা আছে।” রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন স্বীকারোক্তি খুব কমই শোনা যায়। এই একটি বাক্যেই ধরা পড়ে তার অবস্থান—তিনি শিখতে চান, শুনতে চান এবং বোঝার জায়গা থেকে কথা বলতে চান।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে নারীর অংশগ্রহণ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ—সে কথা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু জাইমা রহমান যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করলেন, সেখানে ছিল বাস্তবতার স্বীকৃতি ও ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা। তিনি বললেন, “জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে পেছনে রেখে বাংলাদেশ বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারবে না।” এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় সত্য। নারীকে কেবল ভোটার বা কর্মী হিসেবে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে না দেখলে জাতি গঠনের পথ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে—এই বার্তাই যেন তার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো।

তার বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি বললেন, “আমাদের সবার আদর্শ, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। তবুও আমরা একসঙ্গে বসেছি এবং আলোচনা করছি। এই ভিন্নতা নিয়ে একসঙ্গে কথা বলা এবং একে অপরের কথা শোনা—এটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য।” বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে ভিন্নমতকে প্রায়ই শত্রু হিসেবে দেখা হয়, সেখানে এই বক্তব্য নতুন করে গণতন্ত্রের অর্থ মনে করিয়ে দেয়।

জাইমা রহমানের বক্তব্যে রাজনীতি ছিল না—এমনটা বলা যাবে না। বরং তার বক্তব্য ছিল রাজনীতির গভীরতম জায়গা থেকে উঠে আসা। সেখানে ছিল গণতন্ত্রের দর্শন, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রচিন্তা। তিনি ব্যক্তিগত আবেগের কথাও গোপন করেননি। বললেন, “ভিন্ন এক অনুভূতি ও আবেগ নিয়ে আজ এখানে দাঁড়িয়েছি।” এই স্বীকারোক্তি তার বক্তব্যকে আরও মানবিক করে তোলে।

লন্ডন থেকে গত ২৫ ডিসেম্বর বাবা তারেক রহমান ও মা ডা. জুবাইদা রহমানের সঙ্গে দেশে ফেরার পর এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য। এর আগে আমেরিকা সফর বিএনপির প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে। পরে ইতালির একটি অনুষ্ঠানে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলেও, সেখানে সরাসরি রাজনীতির কোনো উপাদান ছিল না। এমনকি প্রয়াত খালেদা জিয়ার জানাজার দিন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় এলে, বাবার সঙ্গে মেয়েকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এলেও, সেটি ছিল ব্যক্তিগত ও কূটনৈতিক সৌজন্যের পরিসরে।

কিন্তু কেআইবি মিলনায়তনের এই মঞ্চটি ছিল ভিন্ন। এখানে তিনি দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে। এখানেই তার বক্তব্য রাজনীতির সীমা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রচিন্তার জায়গায় পৌঁছেছে। তিনি বললেন, “নিজের ছোট্ট জায়গা থেকেও দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা আমাদের সবার থাকা উচিত।” এই বাক্যটি যেন নাগরিক দায়িত্বের সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার উপস্থিতি রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করলেও, আলোচনার মূল আকর্ষণ ছিলেন জাইমা রহমানই। কারণ, তিনি কোনো দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করেননি, কোনো কর্মসূচির ঘোষণা দেননি। তিনি কথা বলেছেন মূল্যবোধ নিয়ে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু সেই অংশগ্রহণ কেমন হবে—তা নিয়েই প্রশ্ন। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর যাদের ওপর আমরা ভরসা করেছিলাম—কম বয়সি, নতুন, সাহসী—তাদের অনেককেই খুব দ্রুত পুরোনো সিস্টেম গিলে ফেলেছে। কেউ আপস করেছে, কেউ বদলে গেছে, কেউ আবার ঠিক আগের মতোই ক্ষমতার স্বাদে মত্ত হয়েছে। তখনই মনে হয়েছে, এই সিস্টেমের ভেতর জন্মানো, এই সিস্টেমে বড় হওয়া মানুষ দিয়ে কি আদৌ এই সিস্টেম ভাঙা সম্ভব? এই ভাবনার মাঝেই জাইমা রহমানের একটি বক্তব্য শোনা। তাঁর বলার ভঙ্গি, চোখের ভাষা, শরীরী ভাষায়। কথা বলার মাঝে বাবার ছায়া আছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই চেনা রাজনৈতিক দাম্ভিকতা নেই। নেই “আমি জানি সব” ধরনের অহংকার। বরং ছিল এক ধরনের বিনয়, শোনা আর বোঝার চেষ্টা।

এই অক্টোবরেই জাইমার বয়স ৩১। ২০০৮ সালে, মাত্র সাড়ে বারো বছর বয়সে, বাবা-মায়ের সঙ্গে দেশ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। ক্লাস ফাইভ-সিক্সের একটা বাচ্চা তখন। রাষ্ট্র কী, ক্ষমতা কী, দল কী—এই সবের কিছুই তখন বোঝার বয়স ছিল না। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। বলা যায়, তিনি বড় হয়েছেন মূলত ব্রিটিশ সমাজব্যবস্থার ভেতরে, বাংলাদেশি পরিবারে।

তাঁর বাংলা শুনলে বোঝা যায়—একটু বিদেশি টান আছে। বিদেশে বড় হওয়া অনেক বাংলাদেশির মতোই। কিন্তু সেটুকু বাদ দিলে, বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, গুছানো এবং প্রাসঙ্গিক। জাইমা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশের ঘোষণা দেননি। কিন্তু তার বক্তব্য, তার উপস্থিতি এবং তার ভাষা—সব মিলিয়ে এটুকু বলা যায়, এটি ছিল একটি শক্তিশালী সূচনা। শক্তি এখানে সংখ্যায় নয়, শব্দের গভীরতায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে চিৎকার, বিভাজন ও অভিযোগের রাজত্ব, সেখানে জাইমা রহমানের সংযত কণ্ঠ যেন এক ভিন্ন সুর। তিনি দেখালেন, রাজনীতি মানেই কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়—এটি মূল্যবোধের চর্চাও হতে পারে।

এই প্রথম বক্তব্যেই তিনি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি, কোনো দাবি তোলেননি। বরং তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন আমাদের সবার দিকে—আমরা কি সত্যিই একে অপরের কথা শুনতে প্রস্তুত? আমরা কি নারীদের কেবল আলোচনার বিষয় না বানিয়ে, সিদ্ধান্তের অংশীদার করতে চাই?

জাইমা পড়াশোনা করেছেন আইনে। লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যারিস্টার। মানে, রাষ্ট্র কীভাবে চলে, আইন কীভাবে কাজ করে—এই বোঝাপড়া তাঁর আছে। তার সঙ্গে যদি থাকে নৈতিক দৃঢ়তা আর আপসহীন মানসিকতা, তাহলে নতুন কিছু কি অসম্ভব? জাইমা রহমানের এই উপস্থিতি হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাতারাতি কোনো পরিবর্তন আনবে না। কিন্তু এটি একটি বার্তা দিয়েছে—গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখনো হারিয়ে যায়নি, যদি আমরা তা দেখার চোখ রাখি। সিনিয়র নেতারা জাইমা রহমানের মধ্যে খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি দেখছেন। তারা বলেছেন, জাইমা রাজনীতিতে এলে বাংলাদেশের রাজনীতি আরও শক্তিশালী হবে। রাজনীতিতে ‘জিয়া পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে জাইমা রহমানের রাজনীতিতে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেআইবি মিলনায়তনে তার উপস্থিতি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির অংশ।’

রাজনীতির মাঠে নতুন কণ্ঠ সবসময়ই কৌতূহল জাগায়। কিন্তু কিছু কণ্ঠ থাকে, যা কেবল কৌতূহল নয়—আশাও তৈরি করে। জাইমা রহমানের প্রথম উচ্চারণ সেই আশার দিকেই ইঙ্গিত করে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com

Exit mobile version