কিছু মানুষ জন্ম নেন সময়ের প্রয়োজনে, আবার কিছু মানুষ জন্ম নেন সময়কে ছাপিয়ে যাওয়ার জন্য। ইতিহাসে তাঁদের উপস্থিতি হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তাঁদের কর্ম ও আদর্শ যুগ যুগান্তরে প্রভাব বিস্তার করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই একজন মানুষ—যাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বৃত্তে আবদ্ধ নয়; বরং একটি জাতির সংকট, সংগ্রাম, সম্ভাবনা ও সাফল্যের সঙ্গে গভীরভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজও আমরা উপলব্ধি করি—মৃত্যু মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু কীর্তিকে নয়। কারণ কীর্তিমান কেবল অতীতের মানুষ নন; তাঁরা ভবিষ্যতের পথনির্দেশক।
জিয়াউর রহমানের জীবনপ্রবাহ মোটেও মসৃণ ছিল না। একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে সেনাবাহিনীতে তাঁর উত্থান, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী ও সক্রিয় অংশগ্রহণ, এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন দায়িত্ব গ্রহণ—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন সততা ও শৃঙ্খলার প্রতীক, অসম সাহসের নাম এবং দায়িত্ববোধের এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
রাজনীতিতে প্রবেশের বহু আগেই জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন দক্ষ, সাহসী ও নীতিনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর পেশাদারিত্ব, নেতৃত্বগুণ ও কৌশলগত দক্ষতা ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তবে তাঁর প্রকৃত পরিচয় উন্মোচিত হয় ১৯৭১ সালে, যখন তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কেবল স্বাধীনতার ঘোষক বা প্রতীকী নেতৃত্বে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন সম্মুখসারির যোদ্ধা ও সংগঠক। সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা, মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা এবং সীমিত সম্পদ দিয়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য ও অসাধারণ। একজন পেশাদার সৈনিক কীভাবে একটি জাতির মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করতে পারেন—জিয়াউর রহমান তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনেও তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আপসহীন অবস্থান নেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—একটি শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সেনাবাহিনীই একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রধান ভিত্তি।
জিয়াউর রহমানের রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল দায়িত্ববোধ। তিনি ক্ষমতাকে কখনো ভোগের বিষয় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে ক্ষমতা ছিল একটি গুরুদায়িত্ব—যে দায় বহন করতে হয় সততা, সংযম ও আত্মত্যাগ দিয়ে। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসকের নয়, বরং অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও আচরণে এই দায়িত্ববোধ সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তোষামোদ, প্রতিহিংসা কিংবা দোষারোপের রাজনীতি তাঁর চিন্তার জগতে কখনো স্থান পায়নি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো চরিত্রের দৃঢ়তা।
আজ যখন আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলি, তখন আলোচনার কেন্দ্রে থাকে কাঠামোগত পরিবর্তন। অথচ জিয়াউর রহমান আমাদের শিখিয়েছিলেন—সংস্কারের সূচনা হতে হবে মানুষের চিন্তাজগতে। মগজের সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত সংস্কার সম্ভব নয়। এই অর্থে বলা যায় যে,একজন জিয়াউর রহমানের জীবনাদর্শের চেয়ে বড় সংস্কার বাংলাদেশের জন্য আর কিছুই হতে পারে না।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্বের এক কঠিন পরীক্ষা। সেই সময় একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা হয়েও জিয়াউর রহমান অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল এক নৈতিক বিদ্রোহ—যেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপেক্ষা করে, জীবন বাজি রেখে তিনি জাতির মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এই সাহসী ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—দেশপ্রেম কোনো পদবির বিষয় নয়; বরং এটি একটি চেতনাগত অবস্থান। বস্তুত তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার আহ্বান ছিল একটি জাতির সাহস ফিরে পাওয়ার মুহূর্ত।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল প্রায় ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়ানো একটি রাষ্ট্র। বিপর্যস্ত অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন এবং সমাজজুড়ে হতাশা ও অস্থিরতার মধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান যখন নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং রাষ্ট্রকে কার্যকর করার পথে অগ্রসর হন। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি কার্যকর রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।
জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ছিল জাতীয় ঐক্য গঠনের একটি দূরদর্শী প্রয়াস। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ভিত্তিতে তিনি একটি বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের ধারণা উপস্থাপন করেন। কার্যত এই দর্শন সংকীর্ণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বহুত্ববাদী সমাজে ঐক্যের সেতুবন্ধন রচনা করে।
অর্থনীতিতে জিয়াউর রহমান ছিলেন বাস্তববাদী ও কর্মমুখী। তিনি কৃষি, শিল্প ও ব্যক্তিখাতকে উৎসাহিত করে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন। গ্রামীণ উন্নয়ন ও শ্রমের মর্যাদা ছিল তাঁর অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে। খাল কাটা কর্মসূচি আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
তিনি রাজনীতিকে একদলীয় গণ্ডি থেকে বের করে বহুদলীয় ধারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। বাকশালের পরিবর্তে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিসর সম্প্রসারণ করে তিনি গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ রাজনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও বহুমাত্রিক করে তোলে।
জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। ক্ষমতায় থেকেও তিনি ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেননি। ইতিহাসে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রামাণ্য অভিযোগ পাওয়া যায় না। রাজনীতির ইতিহাসে এমন নির্লোভতা সত্যিই বিরল ঘটনা।
১৯৮১ সালের নির্মম হত্যাকাণ্ডে একটি সম্ভাবনাময় ও আলোকিত অধ্যায়ের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তাঁর আদর্শ থেমে যায়নি। তাঁর চিন্তা, সততা ও দায়িত্ববোধ আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
শেষ কথা
জিয়াউর রহমান প্রমাণ করে গেছেন—মানুষ মরে যায়, কিন্তু কীর্তি বেঁচে থাকে। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের, তাঁর রাজনীতি ছিল দায়িত্বের, আর তাঁর আদর্শ ছিল আত্মমর্যাদার। ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়—জিয়াউর রহমান কেবল ইতিহাসের অংশ নন; তিনি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। একজন কীর্তিমান জিয়াউর রহমানের জীবনাদর্শই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিকাশের আলোকবর্তিকা।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com




