ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর দুই দিনের মাথায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইউটিউবে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে বলা হয়, এটি ইসরায়েলের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের নয়।
ভিডিওটি তৈরি করেন ফক্স নিউজের সাবেক উপস্থাপক টকার কার্লসন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেও সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিতে কয়েকবার ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি।
ভিডিওতে কার্লসন বলেন, যুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতা কমে যায়, সমাজে সহিংসতা বাড়ে এবং মানুষের আচরণ দ্রুত বদলে যায়। মানুষের মধ্যে ক্রোধ ও ঘৃণা বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এখনই এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
যদিও ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের বড় একটি অংশ বর্তমান সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছে। তবে জনমত জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকানদের মধ্যেও সবাই এক মত নন।
রিপাবলিকানদের ভেতরে কয়েক মাস ধরেই আমেরিকা ফার্স্ট কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক চলছিল। ইরান যুদ্ধ সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
দলের একাংশের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে দেশের ভেতরে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। এতে ভোটারদের উদ্বেগ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা সামরিক অভিযান শুরু করলে প্রথম দিকে জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখা যায়। কারণ ওই সময় দেশপ্রেমের আবেগে মানুষ রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করে।
কিন্তু এবার সেই চিত্র দেখা যায়নি। রিয়েল ক্লিয়ার পলিটিকসের সংকলিত বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। যুদ্ধ শুরুর পরও সমর্থনের মাত্রা প্রায় একই রয়েছে।
এনবিসি নিউজের একটি জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প যেভাবে ইরানকে মোকাবিলা করছেন তার সঙ্গে ৫৪ শতাংশ মানুষ একমত নন।
দলভিত্তিক বিভাজন অবশ্য স্পষ্ট। ডেমোক্রেটিক সমর্থকদের ৮৯ শতাংশ ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেন না। অন্যদিকে ৭৭ শতাংশ রিপাবলিকান সমর্থক তার কৌশলের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে রিপাবলিকানদের ভেতরেও পার্থক্য রয়েছে। নিজেদের মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন কর্মসূচির সমর্থক বলে পরিচয় দেওয়া অনেকেই যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন।
কিন্তু যারা এই কর্মসূচির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত মনে করেন না, তাদের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ বেশি। এদের মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি মানুষ যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন, আর এক তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ এর বিপক্ষে।
রিপাবলিকান অ্যাকটিভিস্ট ভিশ বুরা বলেন, তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে হতাশ।
আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্প যদি ইরানে স্থল সেনা মোতায়েন করেন, তাহলে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব আরও বাড়তে পারে। কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৫ শতাংশ রিপাবলিকান সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও দলের ৫২ শতাংশ সমর্থক ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর বিরোধী।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারীদের মধ্যে টকার কার্লসন, জো রোগান, মারজরি টেইলর গ্রিনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও আছেন।
মারজরি টেইলর গ্রিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আমরা বিদেশে আর কোনো যুদ্ধ চাই না এবং আর কোনো সরকার পরিবর্তনও চাই না। তিনি অভিযোগ করেন, বিদেশে নতুন যুদ্ধ না করার যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন তা ভঙ্গ হয়েছে।
রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসিও যুদ্ধের বিরোধিতা করে কংগ্রেসে উত্থাপিত একটি প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছিলেন, যদিও সেটি পাস হয়নি।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ট্রাম্প এক সমাবেশে বলেছিলেন, তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো যুদ্ধ দেখতে হবে না এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও হবে না।
তবে ইরানে চলমান সংঘাত এখন তার প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ইরাকে ছয়জন নিহত হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং তেলের দামে এর প্রভাব কতটা পড়বে তার ওপরই ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অনেক কিছু নির্ভর করছে।
সূত্র: বিবিসি