ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। গতকাল বিকালে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা হলো। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এই উত্তরাধিকারের ওপর পাহাড়সম প্রত্যাশা দেশের জনগণের। তারেক রহমান হলেন দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের মধ্য দিয়ে দেশের ক্ষমতা আবার রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরল।
শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিতে তারেক রহমানের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বাস্তবতায় দৃঢ় নেতৃত্বে তিনি এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হবেন বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে নির্বাচনে জয়ের পর প্রতিদ্বন্দ্বী দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে ছুটে যাওয়ার বিরল নজির, প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যের ডাক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ না হয়ে জনকল্যাণের রাজনীতির ঘোষণা দিয়ে জনমনে আশার আলো জ্বালিয়েছেন তারেক রহমান।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি ২১২ আসনে জয়লাভ করে। গতকাল সকালে প্রথমবারের মতো এমপি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। শপথ গ্রহণের প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই বিএনপি সংসদীয় দলের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে রাজধানীর শেরেবাংলানগরে সংসদ ভবন এলাকাজুড়ে সারা দিন ছিল উৎসব ও উচ্ছ্বাসের আমেজ। বিভিন্ন জেলা থেকে সব দলের তৃণমূল নেতা-কর্মী ভিড় জমান। নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার এমপির শপথ অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতেই তাঁদের এই ছুটে আসা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যখন তারেক রহমান শপথবাক্য পাঠ করেন তখন সংসদ এলাকাজুড়ে ছিল উল্লাস। নেতা-কর্মীরা মুহুর্মুহ স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানান নতুন এই রাষ্ট্রনায়ককে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠিত হলো মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান। এর আগে সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যরা সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে তিন ভাগে শপথ নেন। তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। দেশে তিনিই প্রথম সিইসি যিনি সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ালেন। যদিও এ সময় সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে এক দফা নাটকীয়তা হয়। প্রথম ধাপে তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুধু এমপি হিসেবে শপথ নেন। সংবিধানে উল্লেখ না থাকায় বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এরপর দ্বিতীয় ধাপে জামায়াতে ইসলামীর নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ দলের নবনির্বাচিত এমপিরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে পৃথকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় ধাপে স্বতন্ত্র এমপিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। স্বতন্ত্র সদস্যদের সবাই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে পরিচিত ছিলেন। সর্বশেষ তৃতীয় ধাপে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আখতার হোসেনসহ ছয়জন সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। জাতীয় সংসদের সচিব কানিজ মওলা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, বিএনপির ২০৮, জামায়াতের ৬৮, এনসিপির ৬, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ১, খেলাফত মজলিসের ১, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২, বিজেপির ১ ও স্বতন্ত্র ৭ জন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। শপথ শেষে রীতি অনুযায়ী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
বিকালে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নিয়ে ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করে বিএনপি। দেশিবিদেশি হাজারের বেশি অতিথির উপস্থিতিতে শুরুতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এরপর পর্যায়ক্রমে শপথ নেন ২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী।
জানা গেছে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতে পারে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সংসদ পরিচালনার ক্ষেত্রেও তারেক রহমানকে সংসদ নেতা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিরোধী দলের সমালোচনার তির মোকাবিলা করে এগিয়ে নিতে হবে সংসদীয় গণতন্ত্র। শপথ নেওয়ার পরই চমক দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভায় দলের কোনো সংসদ সদস্য ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি বা সরকারি প্লট নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শপথের দিনই চ্যালেঞ্জ নিয়েছে বিএনপি। মহলবিশেষের চাপ থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান সংবিধানে উল্লেখ না থাকায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি দলটির নির্বাচিত এমপিরা। এ নিয়ে সংসদ সচিবালয়ে চলে কয়েক ঘণ্টার নাটকীয়তা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে তারেক রহমান প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেও দেশের রাজনীতি তাঁর আঁতুড়ঘর। তিনি কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী জিয়া পরিবারের উত্তরাধিকারী। তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা বেগম খালেদা জিয়া দুজনই রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ছিলেন। তবে তারেক রহমানের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষস্থানে পৌঁছানোর পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি তাঁকে কারাবাস, নির্যাতন ও বিদেশে সুদীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে। ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি দলের হাল ধরে ছিলেন। মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে বিএনপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে হয়। তাঁর নেতৃত্বে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ভূমিধস বিজয় লাভ করে। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর আজ তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ২০২৪-এর গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী মব ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন নিরসন করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জও রয়েছে নতুন প্রধানমন্ত্রীর সামনে। দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চরম সংকটে। তাঁর সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা। দূর করতে হবে ব্যবসায়ীদের জন্য বিনিয়োগ ও ব্যবসার ভীতিকর পরিবেশ। সেই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসংকট কাটিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখাটাও তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের নানান বিতর্ক কাটিয়ে সরকার ও দলের ভিতর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ধরে রাখা হবে তারেক রহমানের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশকে তাঁর শিকড় থেকে সরিয়ে আনার অপচেষ্টা কঠোরভাবে রুখতে হবে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে।
বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত : পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। গতকাল রাতেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে যান তিনি। সেখানে বাবা-মায়ের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান ও তারেক রহমানের ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি।
এ সময় কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে বিকালে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান।



