News Times BD

দূরপাল্লার নজরদারিতে চীনের নতুন অস্ত্র ‘উড়ন্ত রাডার’ কেজে-৩০০০

চীন তাদের নতুন প্রজন্মের আকাশপথে আগাম সতর্কতা ও নজরদারির বিমান কেজে-৩০০০-এর সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু করে থাকতে পারে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, দেশটির একটি উড়োজাহাজ কারখানায় এ ধরনের তিনটি সম্ভাব্য উৎপাদিত বিমান এপ্রিল মাস থেকেই অবস্থান করছে।

সামরিক বিমান বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিমান পরীক্ষামূলক নমুনা না হয়ে প্রাথমিক উৎপাদন ব্যাচের অংশ হতে পারে। তবে ছবিগুলো থেকে উৎপাদন শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও বিমানগুলো চীনের সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূস্থানিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যান্টর গত ৫ অক্টোবরের স্যাটেলাইট চিত্রে চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের শিয়ান-ইয়ানলিয়াং বিমান চলাচল কমপ্লেক্সে চারটি কেজে-৩০০০ বিমান দেখতে পায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ার জোন (টিডব্লিউজেড) গত সপ্তাহে এ তথ্য প্রকাশ করে।

ছবিতে দেখা যায়, বিমানগুলোর তিনটি শিয়ান এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করপোরেশনের (এক্সএআইসি) কারখানার কাছে পার্ক করা রয়েছে। অন্যটি পাশের চায়না ফ্লাইট টেস্ট এস্টাবলিশমেন্টে অবস্থান করছে। এটি কেজে-৩০০০-এর একটি প্রোটোটাইপ বা পরীক্ষামূলক নমুনা।

এর আগে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাবিষয়ক প্রকাশনা জেনস গত ১৫ মে জানায়, এপ্রিলে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে একই কমপ্লেক্সে কেজে-৩০০০-এর পঞ্চম একটি কাঠামোও দেখা গিয়েছিল।

উৎপাদন শুরু হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মত
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষক বলেন, পাঁচটি বিমানের মধ্যে তিনটির গায়ে ৭৮এক্সএক্স সিরিজের ক্রমিক নম্বর নেই। অন্য দুটি পরীক্ষামূলক বিমানের নম্বর ৭৮২১ ও ৭৮২২। এ কারণে নম্বরবিহীন তিনটি বিমানকে প্রাথমিক উৎপাদন ব্যাচের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কারখানার কাছে থাকা বিমানগুলো এপ্রিল থেকে একই এলাকায় অবস্থান করছে। এক্সএআইসির ওই অংশ সাধারণত সরবরাহের অপেক্ষায় থাকা উড়োজাহাজ রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়। অথচ বিমানগুলোকে পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের জন্য নির্ধারিত এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেজে-৩০০০-এর মতো বিমানের জন্য চীনের এতগুলো অতিরিক্ত প্রোটোটাইপ তৈরির প্রয়োজন কেন হবে, বিশেষ করে যখন এতে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ওয়াই-২০বি পরিবহন বিমানের কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। তার মতে, মূল উড়োজাহাজের কাঠামো পরীক্ষিত হওয়ায় নতুন করে ব্যাপকসংখ্যক প্রোটোটাইপ তৈরির চেয়ে এর বিভিন্ন প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পরীক্ষা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অক্টোবরের স্যাটেলাইট চিত্রে আগের পরীক্ষামূলক বিমান ৭৮২১-কে দেখা যায়নি। বিশ্লেষক বলেন, কেজে-৩০০০ বিমানকে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বিমানবাহিনীর (পিএলএএএফ) কোনও কার্যকর ঘাঁটিতে অবস্থান করতে দেখার প্রমাণও তার কাছে নেই। ফলে কারখানায় বিমানগুলোর উপস্থিতি থেকে উৎপাদন শুরুর সম্ভাবনা তৈরি হলেও সামরিক বাহিনীর কাছে সরবরাহ শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

চীনের সামরিক বিমান চলাচলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস রুপপ্রেখট বলেন, নতুন তৈরি বিমানগুলো সাধারণত কয়েক মাস এক্সএআইসির কারখানায় অবস্থান করে। পরে সেগুলো একসঙ্গে কয়েকটি করে সরবরাহ করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সামরিক ইউনিটগুলো বিমান গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়ার সময়ও এগুলো কারখানায় থাকতে পারে। আবার কিছু বিমানে অতিরিক্ত ব্যবস্থা বা সরঞ্জাম সংযোজনের কাজ চলতে পারে। তবে শুধু স্যাটেলাইট চিত্র দেখে এগুলো সেখানে পড়ে থাকার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

টিডব্লিউজেডের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক জে মাইকেল ডাহম মনে করেন, কেজে-৩০০০-এর ধারাবাহিক উৎপাদন শুরু হয়ে থাকতে পারে। তবে সংবাদমাধ্যমটি সতর্ক করে দিয়েছে, স্যাটেলাইট চিত্রের ভিত্তিতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

পুরোনো কেজে-২০০০-এর জায়গা নিতে পারে নতুন বিমান
কেজে-৩০০০ কার্যকরভাবে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হলে এটি চীনের পুরোনো কেজে-২০০০ আগাম সতর্কতামূলক বিমানের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। প্রায় দুই দশক আগে রুশ নির্মিত ইল-৭৬ পরিবহন বিমানের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে কেজে-২০০০ তৈরি করা হয়েছিল। এ ধরনের মাত্র চারটি বিমান নির্মিত হয়েছে।

টিডব্লিউজেডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উপযুক্ত উড়োজাহাজের কাঠামোর স্বল্পতা কেজে-২০০০-এর উৎপাদন সীমিত রাখার একটি কারণ। তবে রুপপ্রেখটের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল বিমানটির বিশেষায়িত কৌশলগত ভূমিকা, শুধু ইল-৭৬-এর স্বল্পতা নয়। প্রয়োজন হলে চীন আরও ইল-৭৬ বিমানকে আগাম সতর্কতামূলক বিমানে রূপান্তর করতে পারত বলেও তিনি মনে করেন।

কেজে-২০০০ মূলত আকাশপথে কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগ, কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, তুলনামূলক ছোট কেজে-৫০০ বিমানগুলো চীনের অধিকাংশ কৌশলগত ও রণক্ষেত্রভিত্তিক আকাশপথের আগাম সতর্কতা মিশন পরিচালনা করে।

রুপপ্রেখটের ধারণা, কেজে-৩০০০-ও কেজে-২০০০-এর মতো কৌশলগত ভূমিকা পালন করবে। তাই এ ধরনের বিমানের সংখ্যা খুব বেশি হওয়ার প্রয়োজন নাও হতে পারে। এ কারণে ওয়াই-২০ পরিবহন বিমান ও আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমানের উৎপাদনের সঙ্গে কেজে-৩০০০-এর উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও তিনি দেখছেন না।

কোথায় কাজে লাগবে
কেজে-৩০০০-এর সম্ভাব্য সামরিক গুরুত্ব শুধু শত্রুপক্ষের বিমান শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আকাশপথে নজরদারি, বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ এবং যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় সাধনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিমান পিএলএকে বিস্তৃত এলাকায় নজরদারি চালানো এবং সামরিক অভিযান সমন্বয়ে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের আরও গভীর অঞ্চল এবং ভারতের দিকে বিস্তৃত সামরিক কার্যক্রমেও এর ব্যবহার হতে পারে।

রুপপ্রেখটের মতে, এসব অঞ্চলে কেজে-৩০০০ ব্যবহার করা হলে চীনের আকাশপথের নজরদারি ও কমান্ড সক্ষমতায় বড় ধরনের আধুনিকায়ন ঘটবে। তার ভাষায়, এটি হবে সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘এক বিরাট অগ্রগতি’।

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মিচেল ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ২০৩৫ সালে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যুদ্ধের ওপর পরিচালিত একটি যুদ্ধ-অনুশীলনের বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। সেখানে কেজে-৩০০০ ও কেজে-৫০০-কে চীনের সামরিক বাহিনীর উচ্চমূল্যের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আক্রমণের সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণেই বিমানগুলোকে এ শ্রেণিতে রাখা হয়।

রাডার প্রযুক্তি ও আকাশে দীর্ঘক্ষণ থাকার সক্ষমতা
কেজে-৩০০০-এর রাডারব্যবস্থার প্রকৃত বিন্যাস ও কার্যক্ষমতা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে জেনস ২০২৫ সালে জানায়, পরীক্ষামূলক বিমানটির রাডার ডোমের গায়ে থাকা চিহ্ন থেকে ধারণা করা যায়, এতে বিপরীতমুখী দুটি অ্যানটেনা অ্যারে থাকতে পারে। এ ধরনের বিন্যাস বিমানের চারপাশের বিস্তৃত এলাকায় নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট নকশা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি।

বিমানটিতে আকাশে জ্বালানি গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ প্রোব থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। এটি থাকলে উড্ডয়নকালীন জ্বালানি নিয়ে বিমানটি দীর্ঘ সময় আকাশে অবস্থান করতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিতে পারে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতরের এক মূল্যায়নে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, কেজে-৩০০০-এ ডিজিটাল রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে। এতে শত্রুপক্ষের বৈদ্যুতিন জ্যামিং মোকাবিলা, নিষ্ক্রিয় পদ্ধতিতে সংকেত শনাক্ত এবং লক্ষ্যবস্তুর পরিচয় নির্ধারণের সক্ষমতা থাকতে পারে বলে মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়। তবে এগুলো সম্ভাব্য সক্ষমতা; বিমানটির চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য এখনও সীমিত।

কেজে-৩০০০-এর আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো, এটি শুধু নিজে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করবে না, বরং অন্য সামরিক প্ল্যাটফর্মকেও লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করতে পারবে। এর ফলে জাহাজ, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য অস্ত্রব্যবস্থা নিজস্ব সেন্সরের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আরও দূরের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।

২০২৫ সালের মে মাসে চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, দেশটির টাইপ-০৫৫ শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ লাসা একটি আগাম সতর্কতামূলক বিমানের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে নিজস্ব রাডারের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করেই শনাক্তকরণের পরিসর বাড়াতে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বিমানটির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সেটি কেজে-৩০০০ ছিল কি না, তা জানা যায়নি। তবে ঘটনাটি আকাশপথের সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য কীভাবে নৌবাহিনীর দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তার একটি উদাহরণ।

চীনের সামরিক বাহিনী কেজে-৩০০০-এর উৎপাদন শুরু করে থাকলে দেশটির আকাশপথে আগাম সতর্কতা, দূরপাল্লার নজরদারি এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। তবে বিমানগুলো কবে আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক বাহিনীর কাছে সরবরাহ করা হবে এবং কবে থেকে কার্যকর অভিযানে অংশ নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্যাটেলাইট চিত্রে পাওয়া তথ্য আপাতত উৎপাদন শুরুর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে, চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নয়। সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

Exit mobile version