বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদ-কে ধ্বংস করার পরিকল্পিত তৎপরতা শুরু করেন সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। অভিযোগ রয়েছে, নগদ দখলের মতো গুরুতর কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি নিজের বেআইনি সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিতে তিনি ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা দিয়ে নতুন আইনের গেজেট প্রকাশ করান।

সূত্র জানায়, নিজের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজনদের দিয়ে নগদের বোর্ড সাজানোসহ একাধিক কৌশল অবলম্বন করেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই—নগদকে ধ্বংস করা। একের পর এক উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও গত দেড় বছর ধরে নতুন নতুন চক্রান্তের জাল বিস্তার করেন সাবেক গভর্নর। নগদ বিক্রি করে দেওয়া কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জোরপূর্বক যুক্ত করার চেষ্টাও এর বাইরে ছিল না।

 

দায়িত্ব নিয়েই লাইসেন্স স্থগিত, পরে বিক্রির তোড়জোড়

গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব নিয়েই প্রথম সুযোগে নগদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স স্থগিত করেন আহসান এইচ মনসুর। অভিযোগ রয়েছে, নিজের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে আঁচ করতে পেরে তিনি তড়িঘড়ি করে নগদ বিক্রির চেষ্টাও শুরু করেন।

গভর্নর হওয়ার আগেও তার নেতৃত্বাধীন পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউ (পিআরআই) নিয়মিতভাবে আলোচনা সভার মাধ্যমে নগদের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক প্রচারণা চালাত। দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই সমালোচনা রূপ নেয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগে। নগদ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গ্রাহকদের আস্থার কারণেই এত কিছুর পরও প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে।

দখল প্রক্রিয়ায় ভূতাপেক্ষ আইনের প্রয়োগ

দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই, ২১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে, কার্যকর না থাকা পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন দেখিয়ে নগদে সাত সদস্যের প্রশাসক দল নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় দেশে ওই আইন কার্যকর ছিল না। পরে সমালোচনার মুখে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আইনটিকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করে গেজেট প্রকাশ করা হয়—যা আগের বেআইনি সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

আইনটির ৩১ ধারায় প্রশাসক নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও নগদের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, “যে আইনের ক্ষমতা ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদে প্রশাসক নিয়োগ করেছে, সেই আইন তখন কার্যকরই ছিল না। পরে ভূতাপেক্ষ গেজেট দিয়ে বিষয়টি ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে, যা আইনসম্মত নয়।”

ধারাবাহিক বিষোদগার ও নজিরবিহীন পক্ষপাত

গত দেড় বছরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, সংবাদ সম্মেলন ও অনুষ্ঠানে সাবেক গভর্নর একাধিকবার নগদ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। কখনো নগদ বিক্রি করে দেওয়ার কথা বলেছেন, আবার কখনো ‘বিকাশের মতো কোম্পানি’ বানানোর বক্তব্য দিয়েছেন—যা বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো গভর্নরের কাছ থেকে এভাবে প্রকাশ্যে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিষোদগার নজিরবিহীন।

প্রশাসকের হাত ধরে ব্যবসা সংকোচন

প্রশাসক নিয়োগের পর নগদের ব্যবসা কার্যক্রম দৃশ্যমানভাবে সংকুচিত হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে যেখানে নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল ৯ কোটি ৭৬ লাখ, বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৬৩ লাখে—অর্থাৎ দুই কোটির বেশি গ্রাহক হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

দৈনিক লেনদেনও স্থবির। সার্বিকভাবে এমএফএস খাতে লেনদেন ২৫ শতাংশ বাড়লেও নগদের দৈনিক লেনদেন এখনো প্রায় এক হাজার কোটি টাকার আশপাশেই ঘোরাফেরা করছে। বহু প্রতিষ্ঠান গভর্নরের বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে নগদের পেমেন্ট নিতে অনীহা প্রকাশ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গভর্নরের আচরণে ক্ষুব্ধ খাতসংশ্লিষ্টরা

অর্থনীতি পর্যবেক্ষকদের মতে, নগদ নিয়ে সাবেক গভর্নরের আচরণ শুধু সরকারের নয়, পুরো দেশের জন্যই লজ্জাজনক। ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে একটি উদীয়মান কোম্পানিকে ধ্বংস করার চেষ্টা নজিরবিহীন।

ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায়ও দুর্বল ব্যাংকের তালিকা প্রণয়নে পক্ষপাতিত্ব ও আর্থিক অসততার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভালো ব্যাংককে দুর্বল তালিকায় ঢুকিয়ে, প্রকৃত দুর্বল ব্যাংককে বাইরে রাখার অভিযোগ বিষয়টিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলও গভর্নরের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। কাউন্সিল সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ সংবাদ সম্মেলনে তার একতরফা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।

সূত্র জানায়, সাবেক গভর্নর ও তার বর্তমান স্ত্রীর আর্থিক অসততার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে ‘ওপেন সিক্রেট’। পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধেই কর্মকর্তারা প্রতিবাদমুখর হন বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here