ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এবার নারীদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গতকাল নির্বাচনের দিন ভোর থেকে শুরু করে ভোট শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সি নারীরা উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা নিয়ে ভোট দিতে আসেন। ৮০-ঊর্ধ্ব প্রবীণ নারী থেকে প্রথমবার যে নারী ভোটার হয়েছেন সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগে ছিলেন ব্যাপক আগ্রহী। ভোট উৎসবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে নারী ভোটাররা ছিলেন আনন্দিত। এক মাসের নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে একজন
মা যেমন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিলেন একইভাবে বয়স্ক মায়ের হাত ধরে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে এসেছিলেন তার মেয়েও। কর্মজীবী নারী, গৃহিণী, শিক্ষার্থী সব শ্রেণি-পেশার নারীদের বিপুল অংশগ্রহণে এবার ভোটে এক ধরনের ব্যালট বিপ্লব হয়েছে। বিভিন্ন কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসাররা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, এবার ভোটে তরুণীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি নজরে এসেছে। সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট শুরু হওয়ার আগেই গতকাল রাজধানী ঢাকার ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোট দিতে নারীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন। সকালের প্রথম ভাগে যেমন নারীদের ভোটে অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো একইভাবে দুপুরের পরও সেই হার ছিল লক্ষ্যণীয়। নারীরা উৎসবের আমেজে সেজে তাদের পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে ভোট দিতে আসেন। কেন্দ্রগুলোতে সবচেয়ে বেশি এবার তরণীদের উপস্থিতি নজর কাড়ে। এদের মধ্যে বড় একটি অংশই জীবনে প্রথমবার ভোটার হয়েছে। বয়স্ক নারীরা লাঠিতে ভর করে, সন্তানের হাত ধরে ভোট দিতে আসেন। ঢাকা-১৪ আসনের সিভিল অ্যাভিয়েশন স্কুল কেন্দ্রে ৬০ ঊর্ধ্ব মারুফা ইসলামের হাত ধরে ভোট দিতে এসছিলেন ৮১ বছরের হাজরা খাতুন। গত নির্বাচন বাদে দেশের সব কটি জাতীয় নির্বাচনেই তিনি অংশ নেন। এবার ভোটের সকালে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য মেয়েকে তিনি অনুরোধ করেন। এই প্রবীণ নারী বলেন, ‘ভোট দিতে পেরে বেশ ভালো লাগছে। নির্বাচিত সরকার জনগণের জন্য কাজ করবে এবং নারীরা যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে।’ ঢাকা-৯ আসনের খিলগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিসাইডিং অফিসার ইউসুফ আলী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এটি নারী ভোটারদের কেন্দ্র। এখানে মোট ভোটার ৩ হাজার ৩২১ জন। সকালের দিকে ভোটারদের চাপ বেশি ছিল। দুপুরে ঘরের কাজ শেষে নারীরা আবার ভোট দিতে আসছেন। তবে ভোটারদের মধ্যে এবার নতুন নারী ভোটারদের উপস্থিতি বেশি। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহও বেশি।’ এ কেন্দ্রের একজন ভোটার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফা খান মুশফিরা বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ সময়ে দুর্নীতির মধ্যে ছিলাম। নতুন সরকারের কাছে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই। প্রথমবার ভোট দিতে এসে ভালোই লাগছে। বেশ উৎসব উৎসব একটা ভাব। নতুন সরকার নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্ব দিবে বলে আশা করছি।’ ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জেরিন আক্তার বলেন, ‘আমি চাইব নারীরা যাতে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। আগের সরকারের আমলে আমার নামে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোট দেওয়া হয়ে যেত। এবার তেমন হচ্ছে না। এজন্য ভোটাররা বিশেষ করে নারী ভোটাররা মনে করছেন তার ভোটাধিকার গুরুত্বপূর্ণ।’ ঢাকা-১৬ আসনের রূপনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গৃহিণী রিতা আক্তার সকালে ভোট দিয়ে বলেন, ‘এবার ভোটের পরিবেশ খুবই উৎসবমুখর। কোনো ভয়ভীতি নেই।’ তিনি জানান, যোগ্য প্রার্থীকেই জয়ী হিসেবে দেখতে চান। এ ভোট কেন্দ্রে ৭৫ বছর বয়সি মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে বিদেশ থেকে আমাকে ফোন দিয়ে বলেছে তার বন্ধু এবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। এজন্য অসুস্থ হওয়ার পরও ছেলের মন রাখতে ভোট দিতে এসেছি।’ একই আসনের ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের বিউবিটির সম্মান শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আফিয়া ইসলাম বলেন, ‘আমার দেওয়া ভোটের ওপর দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে, এজন্য নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।’
