আমাদের রাজনীতিতে নির্বাচনি ইশতেহার যেন এক ধরনের কাগুজে স্বপ্নের সমাহারে পরিণত হয়েছে। যেখানে কেবল স্থান পায় আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি, আবেগী ভাষা আর রঙিন ভবিষ্যতের ছবি। কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্নের ছোঁয়া দেশের জনগণ কখনোই পায় না । বরং বহু ক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টোটা। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইশতেহার নিয়ে মানুষের বিশ্বাসে বড় ধরনের ভাঙন ধরেছে। আমি মনে করি, আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ মোটেও এক নয়। মানুষ এখন তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, তুলনামূলকভাবে সচেতন এবং একটু করে হলেও প্রশ্ন করতে শিখেছে।  এই বাস্তবতায় ভোটাররা আর সেই পুরনো দিনের স্বপ্নবান্ধব ইশতেহার চান না। তারা চান বাস্তবসম্মত, পরিমাপযোগ্য এবং জনবান্ধব রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

ইশতেহার মূলত একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা। এটি শুধু নির্বাচনের সময় ভোট পাওয়ার কৌশল নয়। বরং ক্ষমতায় গেলে দলটি কীভাবে দেশ চালাবে, কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেবে, কোন পথে সমাধান খুঁজবে—তার একটি লিখিত দলিল। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইশতেহার অনেক সময়ই ছিল প্রতিশ্রুতির বাহার, বাস্তবতার সঙ্গে যার মিল ছিল খুবই কম। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, আগে সুন্দর সুন্দর কথায় মানুষকে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কোনো সদিচ্ছা বা সক্ষমতা দেখা যায়নি।

ফলশ্রুতিতে মানুষ এখন সেই জায়গা থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে। তারা আর শুধু কথায় বিশ্বাস করে না। তারা দেখে অতীত রেকর্ড।  নেতৃত্বের চরিত্র। দেখে প্রার্থীর পরিচয়। দলের ভেতরের চর্চা। ইশতেহারের ভাষা নয়, ইশতেহারের বাস্তবতা যাচাই করেই মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে চায়। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য মোটেও সুখকর নয়।

এখানে ২০০৮ সালের নির্বাচনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। সেই নির্বাচনে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগ। স্লোগানটি তখন অনেকের কাছেই আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ শাসনামলে দেখা গেছে, ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে দুর্নীতি, লুটপাট ও ক্ষমতার অপব্যবহারই বেশি হয়েছে। 
ব্যাংক লুট, শেয়ারবাজার ধস, মেগা প্রকল্পের নামে সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থপাচার—সব মিলিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবে পরিণত না হলেও ‘ডিজিটাল লুটপাট’ বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল। এর ফল ভোগ করেছে পুরো দেশ। 
অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষের আস্থা ভেঙে পড়েছে।
এই অভিজ্ঞতা মানুষ ভুলে যায়নি। তাই আজ কেউ যদি আবার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখাতে চায় তাহলে মানুষ সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেই।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু ঘুষ বা অবৈধ অর্থ লেনদেন নয়। নীতিবর্জিত যেকোনো কাজই দুর্নীতি। ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, বিচারহীনতা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার—সবই দুর্নীতির বিস্তৃত রূপ। এই দুর্নীতিই বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। মানুষের জীবনযাত্রাকে করছে অনিশ্চিত। ব্যবসা-বাণিজ্যকে করছে ঝুঁকিপূর্ণ। তরুণদের ভবিষ্যৎকে করছে অন্ধকারাচ্ছন্ন।

সুতরাং কোনো রাজনৈতিক দল যদি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের কথা বলে, কিন্তু একই সঙ্গে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি বা সন্ত্রাসীদের মনোনয়ন দেয়, তাহলে সেই ইশতেহার আর বিশ্বাসযোগ্য থাকে না। সুন্দর কথার ফুলঝুরি তখন হাস্যকর ও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। সুতরাং এই ধরনের ইশতেহার ইতিহাসের কাছে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তেমনি ভোটারদের কাছেও হবে প্রত্যাখ্যাত। এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

বর্তমান ভোটার কাঠামো এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। মোট ভোটারের একটি বড় অংশ তরুণ। প্রায় সাড়ে চার কোটি তরুণ ভোটার ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী। তাদের বড় অংশ শিক্ষিত। তারা স্মার্টফোন ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। তারা তথ্য যাচাই করে। তারা প্রশ্ন করে। তারা অতীত বিশ্লেষণ করে। ফলে ইশতেহারের চেহারা দেখে নয়, বাস্তবতার আলোকে তারা সিদ্ধান্ত নেবে। কোন রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড কেমন। কে কী করতে পারে, কার অতীত কী, কার দলের সংস্কৃতি কেমন—সবকিছু বিচার করেই তারা এবার ভোট দেবে বলে মনে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ইশতেহার প্রণয়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পুরোনো ধাঁচের আবেগী ভাষা আর কাজ করবে না। এখানে চাই বাস্তবভিত্তিক চিন্তা, স্পষ্ট অগ্রাধিকার এবং জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি। রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত, সুশাসন, দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এসব বিষয়ে বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া ইশতেহার অর্থহীন।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের ইশতেহার প্রস্তুত করতে হবে।

বিএনপি ইতোমধ্যে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা ঘোষণা করেছে। দলটি বলছে, গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তারা ইশতেহার সাজাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো এতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির ইশতেহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’—অর্থাৎ শুধু স্বপ্ন নয়, পরিকল্পনার কথাও বলা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের আদলে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি গড়ে তোলা এবং ১৮ মাসে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে অনেক বড় প্রতিশ্রুতি। তবে এখানেও ভোটারদের প্রশ্ন থাকবে—এই কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে, কোন খাতে হবে, কী ধরনের বিনিয়োগ ও সংস্কার দরকার, এবং তা কতটা বাস্তবসম্মত।

জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কঠোর বার্তা দিচ্ছে। ‘দুর্নীতি করব না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব না’—এই নৈতিক অবস্থান তাদের ইশতেহারের কেন্দ্রে রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনিক সংস্কার, কর্মসংস্থানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা—এসব বিষয়ও তাদের অঙ্গীকারে আছে। এখানেও জনগণ দেখবে, এই নীতিগুলো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে।

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ‘দ্বিতীয় রিপাবলিক’ ও নতুন সংবিধানের কথা বলছে। তাদের ২৪ দফার মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার, ন্যায়ভিত্তিক বিচারব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন, তরুণ ও ছাত্রসমাজকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়গুলো রয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলোকে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।

সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইশতেহার আর এখন শুধু স্বপ্নের কাগজ হতে পারে না। এটি হতে হবে বাস্তবতার দলিল। সেখানে থাকতে হবে অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচি। থাকতে হবে সময়সীমা। থাকতে হবে জবাবদিহির কাঠামো। থাকতে হবে ব্যর্থ হলে দায় নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

মানুষ এখন আর উন্নয়নের গল্প নয়, উন্নয়নের ফল দেখতে চায়। তারা দেখতে চায়—দুর্নীতি কমেছে কি না। আইন সবার জন্য সমান হয়েছে কি না। চাকরি পাওয়া সহজ হয়েছে কি না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নাগালের মধ্যে এসেছে কি না। অর্থাৎ সার্বিক জীবন যাপন সহজ হয়েছে কি না। প্রস্তুতপক্ষে ভোটাররা স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লান্ত। তারা এখন বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

এই পরিবর্তিত সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বার্তা খুবই পরিষ্কার। অবাস্তব স্বপ্ন দেখিয়ে ভোট পাওয়ার দিন শেষ। এখন দরকার বাস্তব ও জনবান্ধব ইশতেহার। যে ইশতেহার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হবে। যে ইশতেহার কথা ও কাজের ফারাক কমাবে। যে ইশতেহার ক্ষমতার নয়, সেবার রাজনীতির প্রতিফলন ঘটাবে।

শেষ কথা:
আমি মনে করি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির মান পরিবর্তনেরও একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে ইশতেহারকে জনগণের কাছে বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূলে অঙ্গীকার থাকতে হবে।
তা না হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে চরম মূল্য দেয়া লাগতে পারে। কারণ, তথ্যপ্রযুক্তির ফলে ভোটারদের একটি বড় অংশই এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হয়ে উঠেছে।
সুতরাং ভোটারদের মন জয় করতে রঙিন স্বপ্ন দেখানোর ইশতেহার এবার আর খুব বেশি কাছে আসবে বলে মনে হয় না।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ahabibhme@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here