ফুটবল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ সময় আজ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত দুইটায় মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স ও উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কো।
চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ফ্রান্স। পাঁচ ম্যাচে পাঁচ জয়, ১৪ গোল, বিপরীতে মাত্র দুটি গোল হজম- এমন দুর্দান্ত পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে কেন দিদিয়ের দেশমের শিষ্যদের শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক ইংল্যান্ড ও আর্সেনাল তারকা ইয়ান রাইটের ভাষায়, “বিশ্বকাপে আমি যত দল দেখেছি, তাদের মধ্যে ফ্রান্স অন্যতম স্পষ্ট ফেভারিট।”
কিলিয়ান এমবাপ্পের দুর্দান্ত গোল করার ধার, তার পেছনে মাইকেল ওলিসে, উসমান দেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলার বিধ্বংসী আক্রমণভাগ- সব মিলিয়ে প্রতিপক্ষের জন্য ফ্রান্স যেন এক দুঃস্বপ্ন। বেঞ্চেও আছেন দেজিরে দুয়ে ও রায়ান শেরকির মতো প্রতিভাবান ফুটবলার। ফলে দলটির শক্তির গভীরতাও ঈর্ষণীয়।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ফ্রান্স কি আদৌ অপ্রতিরোধ্য? নাকি তাদেরও হারানো সম্ভব? মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালের আগে এ নিয়েই মত দিয়েছেন বিবিসি স্পোর্টসের একাধিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক।
ইয়ান ডেনিস: স্পেনই আসল ফেভারিট
বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভের সিনিয়র ফুটবল প্রতিবেদক ইয়ান ডেনিস মনে করেন, ফ্রান্স নয়, এই মুহূর্তে স্পেনই সবচেয়ে শক্তিশালী দল।
তার মতে, স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণে অনেক বেশি দক্ষ, রক্ষণেও তারা প্রতিপক্ষকে খুব কম সুযোগ দেয়। এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টে তারা কোনও গোলই হজম করেনি।
ডেনিস বলেন, “সেনেগালের বিপক্ষে বিরতির আগেই পিছিয়ে পড়তে পারতো ফ্রান্স। এমনকি দুর্বল নরওয়েও তাদের রক্ষণে চাপ তৈরি করেছিল। মরক্কোও তাদের সমস্যায় ফেলতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত স্পেনের বিপক্ষে সম্ভাব্য সেমিফাইনালই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।”
ফিল ম্যাকনাল্টি: ফ্রান্স শক্তিশালী, তবে হারানো অসম্ভব নয়
বিবিসি স্পোর্টসের প্রধান ফুটবল লেখক ফিল ম্যাকনাল্টির মতে, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও কার্যকর ফুটবল খেলেছে ফ্রান্স।
তবে তিনি মনে করেন, সেমিফাইনালে যদি স্পেনের মুখোমুখি হয়, তাহলে সেটিই হবে দেশমের দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেন টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত রয়েছে। শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষে যোগ করা সময়ে গোল করে জয় তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তারা আবারও নিজেদের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছে।
ম্যাকনাল্টির মতে, ফ্রান্স ফেভারিট হলেও স্পেন, আর্জেন্টিনা কিংবা ইংল্যান্ড- সব দলই বিশ্বাস করবে যে, ফরাসিদের হারানো সম্ভব।
এলিজাবেথ কনওয়ে: স্পেনের রয়েছে বাস্তব সুযোগ
বিবিসির সাংবাদিক এলিজাবেথ কনওয়ে মনে করেন, স্পেন অনেকটাই আড়ালে থেকে দারুণ ফুটবল খেলছে।
তারকা লামিন ইয়ামাল এখনও চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ছন্দে ফিরতে না পারলেও দলগত পারফরম্যান্সে স্পেন দুর্দান্ত।
কিশোর সেন্টারব্যাক পাও কুবার্সি ও অভিজ্ঞ আইমেরিক লাপোর্তের জুটি এখন পর্যন্ত কোনও গোল হজম করেনি। অন্যদিকে রদ্রি ও পেদ্রি মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখছেন।
কনওয়ের মতে, সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে স্পেন অবশ্যই ফ্রান্সকে হারাতে সক্ষম।
জন মারে: সুন্দর ফুটবল সব সময় শিরোপা এনে দেয় না
বিবিসি রেডিওর অভিজ্ঞ ধারাভাষ্যকার জন মারে বলেন, এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবল খেলছে ফ্রান্স।
তবে ইতিহাস বলছে, অনেক সময় সবচেয়ে নান্দনিক ফুটবল খেলা দলও বিশ্বকাপ জিততে পারে না। তিনি ১৯৮২ সালের ব্রাজিল, ১৯৮৬ সালের ডেনমার্ক, ২০০৬ সালের জার্মানি এবং ২০১৪ সালের ব্রাজিলের উদাহরণ টেনে বলেন, স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ফ্রান্স হেরে গেলেও তা বিস্ময়কর হবে না।
নিল জনস্টন: ফ্রান্সের আসল শক্তি এখনও পুরোপুরি দেখা যায়নি
বিবিসির সাংবাদিক নিল জনস্টনের মতে, ফ্রান্স এখনও তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দেখায়নি।
দুই ঘণ্টার ঝড়ের কারণে ম্যাচ বিলম্ব, এক ম্যাচে কোচ দেশমের অনুপস্থিতি এবং প্যারাগুয়ের কঠিন কৌশল- সব বাধা অতিক্রম করেও দলটি শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে।
তার মতে, এমবাপ্পে, ওলিসে ও দেম্বেলের সম্মিলিত গোল অবদান ইতোমধ্যে ২০-এ পৌঁছেছে। পাশাপাশি ফ্রান্স এখন পর্যন্ত কোনও ম্যাচেই পিছিয়ে পড়েনি।
রক্ষণেও উইলিয়াম সালিবা ও দাইও উপামেকানোর জুটি দারুণ দৃঢ়তা দেখিয়েছে। জনস্টনের বিশ্বাস, স্পেন বড় পরীক্ষা হলেও বেঞ্চের গভীরতা ও আক্রমণভাগের শক্তিতে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে ফ্রান্স।
অ্যালেক্স হাওয়েল: ফ্রান্সকে থামাতে পারে ইংল্যান্ড
বিবিসির ইংল্যান্ড প্রতিবেদক অ্যালেক্স হাওয়েল মনে করেন, সম্ভাব্য ফাইনালে ইংল্যান্ডই ফ্রান্সকে হারাতে পারে।
তার মতে, ডেকলান রাইস, এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও জুড বেলিংহামের মাঝমাঠ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে শারীরিক ও কৌশলগত লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, “ইংল্যান্ড যদি ফ্রান্সকে হারাতে পারে, সেটিই হবে দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন।”
জন বেনেট: ফ্রান্সের শক্তিই কি দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে?
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের জন বেনেটের মতে, ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ। তবে সেটিই বড় দলের বিপক্ষে দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
মাইকেল ওলিসেকে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডে খেলানোয় দল আরও ভয়ঙ্কর হয়েছে। কিন্তু স্পেনের মতো বল দখলে পারদর্শী দলের বিপক্ষে মাঝমাঠে সংখ্যাগত ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ওলিসে কি প্রয়োজনীয় রক্ষণাত্মক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? মরক্কো কিংবা সম্ভাব্য সেমিফাইনালে স্পেন এই জায়গাটিকেই লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
গ্যারি রোজ: মরক্কোকেও অবহেলা করা যাবে না
বিবিসির সাংবাদিক গ্যারি রোজ মনে করিয়ে দিয়েছেন, নকআউট পর্বে যেকোনও দলই যেকোনও দলকে হারাতে পারে।
চার বছর আগে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলা মরক্কো এখন আরও পরিণত দল। তাদের রক্ষণ অত্যন্ত সংগঠিত এবং প্রতিপক্ষকে হতাশ করতে তারা সিদ্ধহস্ত।
তার মতে, মরক্কো যদি ফ্রান্সকে আটকে রাখতে পারে, তাহলে জয়ও অসম্ভব নয়। এমনকি পুরো বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ফ্রান্স ফেভারিট, তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়
বিবিসির অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই একমত যে, বর্তমান বিশ্বকাপে সবচেয়ে শক্তিশালী দল ফ্রান্স। তবে একই সঙ্গে তাদের বিশ্বাস, স্পেন, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা কিংবা মরক্কোর মতো দলগুলো সেরা খেলাটা খেলতে পারলে ফরাসিদের হারানো সম্ভব।
অর্থাৎ, ফ্রান্স শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হলেও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনও ফলই আগে থেকে নিশ্চিত নয়। সূত্র: বিবিসি
