২০২৬ সালের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশটি শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার কৌশলটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তীতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ও চরমপন্থি সমীকরণ তৈরি করেছে। 

বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে যেভাবে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে, তা আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ইতিহাসে নজিরবিহীন। ওয়াশিংটনের এই মারমুখী অবস্থান এখন বিশ্বের অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দাবি করছে।

 

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক রবার্ট পেপের মতে, একটি দেশের নেতৃত্ব হলো সেই দেহের মস্তিষ্কের মতো, যা ধ্বংস হলে পুরো শরীর অচল হয়ে পড়ে। এই তত্ত্বকে বাস্তব রূপ দিতেই ট্রাম্প প্রশাসন এখন ‘এপিক ফিউরি’র মতো অপারেশন পরিচালনা করছে। যার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষকে নেতৃত্বশূন্য করে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা তৈরি করা। কোনো সংগঠনের ক্যারিশম্যাটিক নেতাকে সরিয়ে দিলে কেবল তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার যোগ্য উত্তরসূরি পাওয়া কঠিন হয় না, বরং পুরো ব্যবস্থার মধ্যেই এক ধরনের পক্ষাঘাত তৈরি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের শাসনব্যবস্থা ঠিক কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। কারণ, একের পর এক হামলায় দেশটির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের প্রায় সবাই এখন মৃত।

এদিকে মার্কিন এই কৌশলী অবস্থান উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং-উনকেও চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বলে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে। উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো যেখানে পুরো শাসনকাঠামো কেবল একজন ব্যক্তির চারপাশেই আবর্তিত হয়, সেখানে এই ‘নেতৃত্ব লক্ষ্যবস্তু’ করার কৌশলটি অনেক বেশি কার্যকর ও প্রাণঘাতী হতে পারে। সিউলভিত্তিক বিশ্লেষকদের মতে, পিয়ংইয়ং এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক কারণ তারা বুঝতে পারছে যে মার্কিন ড্রোন বা স্পেশাল ফোর্সের লক্ষ্যবস্তু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় কিম জং-উন এখন তার চলাফেরা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করছেন যা আদতে তার শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতাকেই সংকুচিত করে তুলছে।

ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের গুপ্তহত্যা বা টার্গেটেড কিলিংয়ের পথে হাঁটলেও আশির দশকে রোনাল্ড রিগান স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন পরবর্তী ‘ওয়ার অন টেরর’ এবং বারাক ওবামার শাসনামলে এই আইনি কাঠামোতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা হয়। ওবামা প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল যে ইউনিফর্মধারী সৈন্যদের বাইরে যখন কোনো শত্রু কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা না মেনে যুদ্ধ করে, তখন তাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক হামলা চালানো গুপ্তহত্যার পর্যায়ে পড়ে না। 

এই আইনি মারপ্যাঁচকেই এখন ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি সরাসরি একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাকে সরিয়ে দেওয়াকে বৈধতা দিচ্ছেন।

মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের হামলায় সম্মুখ সমরে সৈন্য পাঠানোর ঝুঁকি কমে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতিও সীমিত রাখা সম্ভব হয়। বিশাল স্থল হামলার চেয়ে সুনির্দিষ্ট ড্রোন হামলা বা ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক। তবে এর অন্ধকার দিকটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই কারণ অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রতিপক্ষের মধ্যে ‘শহীদি চেতনা’র জন্ম দেয় যা দীর্ঘমেয়াদে আরও কট্টরপন্থী নেতৃত্বের উত্থান ঘটাতে পারে। সমালোচকরা মনে করছেন, ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক হয়তো সাময়িকভাবে শত্রুকে দুর্বল করে দেয়, কিন্তু একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে এটি সবসময় ব্যর্থ হয়েছে।

ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো মার্কিন প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবকেই স্পষ্ট করে তুলছে। যখন প্রশ্ন করা হয় যে এই ধ্বংসযজ্ঞের পর তারা কার সাথে সমঝোতা করবেন, তখন ট্রাম্পের উত্তর ছিল যে যাদের সাথে কথা বলার পরিকল্পনা ছিল তারা প্রায় সবাই এখন মৃত। এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসের শুনানিতে জানিয়েছেন যে তাদের বর্তমান লক্ষ্য হলো আগে শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং রাজনৈতিক পুনর্গঠনের বিষয়টি পরে ভাবা হবে। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ‘কৌশলের ওপর রণকৌশলের জয়’ হিসেবে বর্ণনা করছেন, যা অনেকটা ধ্বংস করার পর পুনর্গঠনের চিন্তা করার মতো অবিবেচনাপ্রসূত কাজ।

মার্কিন প্রভাবশালী কলামিস্ট ডেভিড ইগনাশিয়াস একে ‘আমেরিকান ওয়ে অফ ওয়ার’ বা আমেরিকার যুদ্ধের নতুন ধরন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি মনে করেন, সাদ্দাম হোসেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি কিংবা ওসামা বিন লাদেনের সময় থেকেই এই বীজ বপন করা হয়েছিল। ইসরায়েল যেভাবে বছরের পর বছর ধরে তাদের শত্রুদের বিদেশের মাটিতে ড্রোন বা বিমান হামলার মাধ্যমে খতম করে আসছে, ওয়াশিংটন এখন সেই একই পথ পূর্ণ শক্তি দিয়ে অনুসরণ করছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইনের যে লঙ্ঘন ঘটছে এবং সার্বভৌমত্বের যে প্রশ্ন উঠছে, তার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না হোয়াইট হাউস।

ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক বা নেতৃত্ব নির্মূল করার এই নীতি হয়তো সাময়িকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করছে, কিন্তু এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা বিশ্বকে আরও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে কোরীয় উপদ্বীপ পর্যন্ত সর্বত্রই এখন এক অজানা আশঙ্কার কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন যদি কেবল ধ্বংস করার মধ্যেই তাদের রণনীতি সীমাবদ্ধ রাখে, তবে ভবিষ্যতে এই দেশগুলোতে গণতন্ত্র বা স্থিতিশীলতা ফেরানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে দেখার জন্য যে ইরানের পর পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কার নাম তালিকায় ওঠে এবং এই ধ্বংসাত্মক কূটনীতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়।

সূত্র: ইউরোশিয়ান টাইমস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here