News Times BD

বৃটেনে চোখের চিকিৎসায় যুগান্তকারী উদ্ভাবন, প্রায় অন্ধ হওয়া চোখে অপারেশন ছাড়া ফিরিয়ে আনা হলো দৃষ্টিশক্তি

চোখের রোগ হাইপোটনি-তে আক্রান্ত রোগীদের দৃষ্টিশক্তি অপারেশন ছাড়া ফিরিয়ে এনেছেন লন্ডনের মুরফিল্ডস আই হাসপাতালের একদল চিকিৎসক। অপারেশন ছাড়া শুধু ইনজেক্শনের মাধ্যমে চোখের ”হাইপোটনি ” রোগের চিকিৎসা পাওয়া প্রথম রোগী ৪৭ বছর বয়সী নিকি গাই এখন সম্পূর্ণ দেখতে পাচ্ছেন।   
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যে কাজটি একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছিল, সেটিই তারা করে দেখিয়েছেন। বিরল কিন্তু মারাত্মক চোখের রোগ হাইপোটনি-তে আক্রান্ত রোগীদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা এবং অন্তত রোগটির অগ্রগতি প্রতিরোধে তারা সফল হয়েছেন। লন্ডনের মুরফিল্ডস আই হাসপাতাল এখন বিশ্বের প্রথম চিকিৎসাকেন্দ্র, যেখানে এই রোগের জন্য আলাদা চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। একটি পাইলট গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষামূলক এই চিকিৎসা দেয়া ৮ জন রোগীর মধ্যে ৭ জনের অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এই চিকিৎসা পাওয়া প্রথম রোগী ৪৭ বছর বয়সী নিকি গাই। তিনি তার অভিজ্ঞতা বিবিসির সঙ্গে শেয়ার করেছেন। নিকি বলেন, ফলাফল ছিল “অবিশ্বাস্য” এটি তার জীবনই বদলে দিয়েছে। তিনি আবার তার সন্তানের বেড়ে ওঠা দেখতে পারছেন। 
চিকিৎসার আগে তার অবস্থা ছিল এমন যে, তিনি শুধু আঙুল গুনতে পারতেন এবং সবকিছু ঝাপসা দেখাত। এখন তিনি আবার স্বাভাবিকভাবে দেখতে পাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি পরীক্ষার চার্টে থাকা অক্ষরও পড়তে পারেন। নিকি জানান, তিনি আইনগতভাবে গাড়ি চালানোর যোগ্যতা অর্জনের মাত্র এক লাইনের দূরত্বে আছেন যা আগের তুলনায় বিশাল পরিবর্তন। এর আগে তিনি আংশিক দৃষ্টিহীন ছিলেন। কাছের কোনো কিছু দেখতে হলে আতস কাচ ব্যবহার করতে হতো এবং ঘরের ভেতর বা বাইরে চলাফেরার সময় স্মৃতির ওপর নির্ভর করতে হতো। নিকি বলেন, তিনি একসময় ভেবেছিলেন জীবনের বাকি সময়টা হয়তো এভাবেই কাটবে দৃষ্টি থাকবে না, কখনো গাড়ি চালাতে পারবেন না। সে বাস্তবতাও তিনি মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন, কারণ তিনি এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিলেন, যেখান থেকে আর কোনো আশা দেখছিলেন না। 

হাইপোটনি রোগে চোখের ভেতরের চাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যায়। এর ফলে চোখের গঠন ভেঙে পড়তে শুরু করে। সাধারণত চোখের ভেতরের জেলির মতো পদার্থ ঠিকমতো তৈরি না হলে, আঘাত লাগলে বা প্রদাহের পর এমনটি হতে পারে। কখনো কখনো এটি চোখের অস্ত্রোপচার বা নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও দেখা দেয়। চিকিৎসা না হলে রোগী সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যেতে পারে। 
আগে চিকিৎসকেরা চোখের চাপ বাড়াতে সিলিকন অয়েল ব্যবহার করতেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো বিষাক্ত হতে পারে এবং দৃষ্টিশক্তি খুব একটা ফেরাতে পারে না। এমনকি চোখের পেছনের দৃষ্টি-সংক্রান্ত কোষগুলো কার্যকর থাকলেও সিলিকন অয়েলের কারণে দৃষ্টি ঝাপসাই থেকে যায়। 

এই সমস্যার সমাধানে মুরফিল্ডসের চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তারা ব্যবহার করেন স্বচ্ছ, জলভিত্তিক ও কম খরচের একটি উপাদান হাইড্রক্সিপ্রোপাইল মিথাইলসেলুলোজ (HPMC)। এটি আগে থেকেই কিছু চোখের অস্ত্রোপচারে ব্যবহার হয়ে আসছিল। তবে এবার এটিকে একবারের জন্য নয়, বরং নিয়মিত চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ হিসেবে চোখে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। 
নিকি জানান, ২০১৭ সালে তার ছেলের জন্মের পরপরই তার ডান চোখে প্রচুর সিলিকন অয়েল দেওয়া হয়েছিল। হাইপোটনির কারণে চোখটি স্বাভাবিক আকার হারিয়ে কাগজের মতো ভেঙে পড়েছিল। সেই চিকিৎসা খুব একটা কাজে আসেনি। কয়েক বছর পর একই সমস্যা তার বাম চোখেও দেখা দেয়। 

নিকি বলেন, যখন বাম চোখের দৃষ্টি হারাতে শুরু করল, তখন ভাবলাম কিছু একটা করতেই হবে। হাল ছাড়তে চাইনি। 
নিকির চিকিৎসক ও সার্জন হারিট কুশিন বলেন, তারা দুজন মিলে নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, একমাত্র কার্যকর চোখে এমন একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা প্রয়োগ করা তাদের জন্য বড় ঝুঁকি ছিল। কারণ, যদি ব্যর্থ হতো, রোগী সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন হয়ে পড়তেন। 
তিনি আরও বলেন, এটি মূলত একটি পাইলট প্রকল্প ছিল। কিন্তু যেসব রোগী দুই চোখেই দৃষ্টিহীন হয়ে সারাজীবন অন্ধত্ব নিয়ে বাঁচতে বাধ্য হতেন, তাদের জন্য এই চিকিৎসা যে এত অসাধারণ ফল দেবে তা তারা নিজেরাও কল্পনা করেননি। 

Exit mobile version