News Times BD

হরমুজ সমস্যায় ঝুঁকিতে আমদানি-রপ্তানি

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই আশঙ্কার প্রভাব সরাসরি পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। দীর্ঘতর শিপমেন্ট সময়, বাড়তি পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশের রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ব্যবসায়ীদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান ট্রানজিট হাবগুলো দিয়ে ফ্লাইট চলাচল আংশিক বা পুরোপুরি স্থগিত হতে পারে। এতে কার্গো পরিবহনে বিলম্ব, এয়ার ও সিফ্রেইট ভাড়া বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হবে। এর ফলে বৈশ্বিক মন্দা, ডলার সংকট ও উচ্চ সুদের চাপে থাকা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য খাত আরও সংকটে পড়তে পারে।

চট্টগ্রাম-ইউরোপ রুটে বাড়ছে অনিশ্চয়তা : বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ইউরোপগামী জাহাজগুলোর একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়েই যাতায়াত করে। এই গুরুত্বপূর্ণ রুট অচল হয়ে গেলে জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ পথ যেমন কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হবে। এতে যাত্রাপথ কয়েক হাজার কিলোমিটার বেড়ে যাবে এবং শিপিং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। শিল্প খাতের নেতারা বলছেন, ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই সীমিত হলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সামগ্রিক প্রভাবই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা, সময়মতো পণ্য ডেলিভারি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

এয়ার ফ্রেইটে সংকট, ইউরোপমুখী রপ্তানি চাপে : ইউরোপে রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক ক্রেতাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পেতে এয়ার ফ্রেইটের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই কার্গো ফ্লাইট ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সময়সংবেদনশীল পোশাক ও নিটওয়্যার রপ্তানিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক শিপিং জায়ান্ট সিএমএ সিজিএম ও হ্যাপাগ-লয়েড নাকি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থগিত রেখে বিকল্প রুটে জাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির গভীরতা ও বৈশ্বিক ঝুঁকির মাত্রাই নির্দেশ করে।

ব্যবসায়ী নেতাদের আশঙ্কা : বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা আমরা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। নতুন করে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, যে সময় আমরা ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করছিলাম, তখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করতে পারে। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, পশ্চিমা বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ট্রানজিট হাবগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প এয়ার ট্রানজিট সুবিধা পুনরুদ্ধারে সরকারের উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান।

জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে চাপের আশঙ্কা : বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে জ্বালানি আমদানি ব্যয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচে, বাণিজ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতিতে। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল, এলএনজি ও এলপিজি আমদানিতেও বিঘ্ন ঘটতে পারে। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আমরা আলোচনা করেছি। সরবরাহ ব্যবস্থা যেন নির্বিঘ্ন থাকে, সে জন্য পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, এই মুহূর্তে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। দেশে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সীমিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, ঝুঁকি মূলত পরোক্ষ : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইরানে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ডলার মূলত পাট, সুতা এবং আমদানি ছিল মাত্র ৫ লাখ ডলার। বহু বছর ধরেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান সংকটের মূল ঝুঁকি সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষ ও কাঠামোগত। হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এটি সরাসরি বাণিজ্যিক সংকট না হলেও রপ্তানি, লজিস্টিক, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ তৈরি করতে পারে। সময়োপযোগী নীতি সহায়তা, বিকল্প লজিস্টিক প্রস্তুতি এবং সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ না নিলে রপ্তানি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণই হতে পারে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

Exit mobile version