সর্বশেষ
Home » জাতীয় » সরকারের শপথ ও সাংবিধানিক জটিলতা

সরকারের শপথ ও সাংবিধানিক জটিলতা

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার শপথ নিচ্ছে ১১ জানুয়ারি ২০২৪। অথচ একাদশ সংসদের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি, শেষ হবে ২৯ জানুয়ারি। ফলে বিদ্যমান সরকারের মেয়াদও ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকছে। কারণ সংসদের মেয়াদের সাথে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের মেয়াদও জড়িত। যেহেতু একাদশ সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২৯ জানুয়ারি সুতরাং সরকারকে অবশ্যই শপথ নিতে হবে ২৯ জানুয়ারির পর। একাদশ সংসদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় দ্বাদশ সংসদ কার্যকর করা যাবে না এবং সরকারও শপথ নিতে পারবে না। একাদশ সংসদের মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত দ্বাদশ সংসদের সদস্যগণ কার্যভার গ্রহণ করিবেন না- অর্থাৎ ১২৩(৩)ক এর শর্ত মেনেই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং এখন শর্ত লঙ্ঘনের কোন উপায় নেই।
দুই কারণে সংসদের মেয়াদ শেষ হতে পারে।
১. রাষ্ট্রপতি ভাঙ্গিয়া দিলে এবং
২. মেয়াদের অবসান হলে।
কিন্তু একাদশ সংসদ রাষ্ট্রপতি ভাঙ্গিয়া দেন নাই এবং মেয়াদের অবসানও ঘটেনি। ফলে ১১ জানুয়ারি সরকারের শপথ গ্রহণের সাংবিধানিক কোনো সুযোগ নেই।
কিছুদিন পূর্বে বর্তমান রাষ্ট্রপতিকেও নির্বাচিত হওয়ায় পর শপথের জন্য অনেকদিন অপেক্ষমান থাকতে হয়েছে। কারণ পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি শপথ গ্রহণ বা দায়িত্ব নিতে পারেন না।
প্রধান বিচারপতির শপথের বেলায়ও প্রধান বিচারপতিকে অপেক্ষমান থাকতে হয়েছে, পূর্ববর্তী প্রধান বিচারপতির মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
যেহেতু সংবিধানের ৪৮( ২) মোতাবেক রাষ্ট্রপ্রধান রূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে -তারপরও দায়িত্ব নেয়ার জন্য অপেক্ষামান থাকতে হয় সেখানে পূর্ববর্তী সংসদ থাকা অবস্থায় কিভাবে পরবর্তী সংসদের সদস্যগণ শপথ নিবেন। রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান বা বিচার বিভাগের প্রধান পৃথিবীর কোথাও শপথ নিতে পারেন না, পূর্বসূরীর মেয়াদ অবসান ব্যতীত।
পূর্ববর্তী সংসদের মেয়াদ থাকা অবস্থায় এর পূর্বেও দুইবার সংসদ সদস্যগণ শপথ নিয়েছেন। সংবিধানের সাথে ইহা যে সাংঘর্ষিক তা নিয়ে প্রতিবার মানবজমিনে নিবন্ধ প্রকাশ করে সরকারের আইনমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি। এমনকি সংবিধানের এই ধারাবাহিক বিচ্যুতি নিয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য কয়েকবার প্রস্তাব উত্থাপন করেছি।
সংসদের মেয়াদ এবং সরকারের শপথ এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেখানে সাংবিধানিক জটিলতা জড়িত সেটা নিরসনের উদ্যোগ নির্বাহী বিভাগ বা আইন বিভাগ কেউ গ্রহণ করেনি। এমনকি এই ধরনের জনগুরুত্বসম্পন্ন ও সাংবিধানিক জটিলতার প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালতের কোন নির্দেশনাও নেই।
মূল প্রসঙ্গটি হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। আমাদের সংবিধানে ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- (ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; তবে শর্ত থাকে যে এই দফার (ক) উপদফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।
১২৩ (৩) ‘ক’ নিরঙ্কুশ নয় শর্ত যুক্ত অনুচ্ছেদ।
শর্তটা হচ্ছে- মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্যগণ শপথ নিতে পারবেন না। এই শর্ত লঙ্ঘন করলে সংসদ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে উপরোক্ত অনুচ্ছেদ সংযুক্ত হওয়ার পর দশম, একাদশ এবং দ্বাদশ সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত দশম, একাদশ এবং দ্বাদশ ৩টি সংসদই শর্ত লঙ্ঘন করেছে। পূর্ববর্তী সংসদের মেয়াদ অবসানের পূর্বেই শপথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নির্বাচিত সদস্যগণ কার্যভার গ্রহণ করেছে। সংসদ সদস্যগণের শপথ ও কার্যভার গ্রহণ করার পর প্রজাতন্ত্রের সরকার গঠন করা হয়েছে। এতে এক সংসদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আরেক সংসদ গঠন এবং সরকার গঠন স্বভাবতই আইন বহির্ভূত হয়ে যায়। নির্বাচন হলেই সংবিধানের শর্ত লঙ্ঘন হচ্ছে কিন্তু এর কারণ অনুসন্ধান করে সংবিধান সংশোধন করা হচ্ছে না।
সংবিধান লঙ্ঘনে প্রজাতন্ত্রের সকল প্রতিষ্ঠান নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়ে গেলে সংবিধান মান্য করার নৈতিক শক্তি হারিয়ে যাবে। সংসদ বহাল রেখে
আরেক সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানই এই জটিলতার উৎস। সংসদের মেয়াদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সংসদ সদস্যদের শপথ ও সরকার গঠনের আইনগত জটিলতা অবসানে ১৮তম সংশোধনী আনয়নে শুধুমাত্র একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সংবিধানের ১৮তম সংশোধনীর প্রস্তাবনা:
বিদ্যমান সংবিধানের ১২৩ (৩) ‘ক’ এবং ‘খ’ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নরূপ অনুচ্ছেদ ১২৩(৩ক) প্রতিস্থাপিত হইবে:
‘সংসদের মেয়াদ অবসান এবং ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ -সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
এই অনুচ্ছেদটুকু যুক্ত করলেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত সংবিধান লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতার সমাপ্তি ঘটবে।
লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *