সর্বশেষ
Home » অপরাধ » ঢাকার ইবনেসিনা হাসপাতালে রুশ কিশোরীর শ্লীলতাহানি

ঢাকার ইবনেসিনা হাসপাতালে রুশ কিশোরীর শ্লীলতাহানি

রাজধানীর কল্যাণপুরে অবস্থিত বেসরকারি ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শরীরে ফোঁড়ার অপারেশন করাতে এসেছিলেন রুশ কিশোরী। সঙ্গে ছিলেন তার মা। সেখানে হাসপাতালের এক কর্মীর দ্বারা শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে ওই কিশোরী। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী কিশোরীর মা।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডের অভিযুক্ত ওয়ার্ডবয় আবুল কাশেমকে তাৎক্ষণিক স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি রাতে হাসপাতালের ১৪ তলায় অবস্থিত সার্জারি ওয়ার্ডের একটি কেবিন কক্ষে এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে হাসপাতালের একাধিক সূত্র। এ সময় কেবিনটিতে রুশ কিশোরী এবং তার মা অবস্থান করছিলেন। ঘটনার ৫ দিন পর গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি মিরপুর মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করেন কিশোরীর মা। ঘটনার পরপরই ওয়ার্ডবয় কাশেম পালিয়ে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে তা অবহিত করলে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেপ্তার করে।
অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম আবুল কাশেম। গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নাসির আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, রুশ কিশোরী বনানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরে গেছে। এ ঘটনায় মামলার একমাত্র আসামি ওয়ার্ডবয় কাশেমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে দায়িত্বরত এক চিকিৎসক মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার দিন আমার ডিউটি ছিল না। আমি আমার সহকর্মী চিকিৎসকের সঙ্গে ডিউটি পরিবর্তন করি। তিনি মূলত সেদিন ডিউটি পালন করছিলেন। তবে যতদূর জেনেছি এক রুশ কিশোরীর শরীরে ওয়ার্ডবয় কাশেম ব্যাড টাচ করেছে। কিশোরীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করার পরে সকালে তার মা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। পরে পুলিশকে খবর দিলে কাশেম হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। এরপর তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় আমরা হতভম্ব হয়ে গেছি। একজন কিশোরী তারপর আবার বিদেশি নাগরিক, তার সঙ্গে এ ধরনের আচরণ গুরুতর অন্যায়। এদিকে রাশিয়ান নাগরিক ভুক্তভোগী কিশোরীর মায়ের করা মিরপুর মডেল থানায় মামলার বর্ণনায় বলা হয়, ভুক্তভোগী কিশোরীর মা রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজে নিয়োজিত। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি কোম্পানির চিকিৎসা উপদেষ্টার নির্দেশে মেয়েকে নিয়ে রাত ১টার দিকে চিকিৎসার জন্য কল্যাণপুরে অবস্থিত ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসি। সেখানে ডাক্তারের পরামর্শে আমার মেয়েকে ভর্তি করানো হয়। তার ডান হাতের নিচে একটা ফোঁড়া হয়েছিল। এবং যার জন্য অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল। আমাদের হাসপাতালের ১৪০৯ নম্বর রুমে রাখা হয়েছিল। এবং যেটা ছিল নার্সদের স্টেশন থেকে এক কক্ষ দূরে। ঘটনার দিন রাত ২টার দিকে কর্তব্যরত ডাক্তার আনোয়ার হোসেন আমাদের কাছে আসেন। এবং তার সঙ্গে নীল ইউনিফর্ম পরা একজন (ওনার নাম সম্ভবত কাশেম আমি নিশ্চিত নই) ছিলেন। ডাক্তার আমার মেয়েকে ফোঁড়া দেখাতে বললেন। ফোঁড়াটি যেহেতু সংবেদনশীল জায়গার কাছাকাছি ছিল তাই জায়গাটি দেখানো একটু কঠিন ছিল আমার মেয়ের জন্য। তখন সে বিব্রতবোধ করছিল। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, কর্তব্যরত ডাক্তার তার পাশে থাকা নীল গাউন পরা ব্যক্তিকে নির্দেশ দেন। নার্স যখন এলেন তখন আমার মেয়ে তার ক্ষতস্থান দেখায়। তার শরীরের কিছু অংশ একটু উন্মুক্ত ছিল। এবং সেই সময় নীল গাউন ওয়ার্ডবয় কাশেম ঘর থেকে বের না হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন কর্তব্যরত ডাক্তার কিংবা নার্স কেউই তাকে রুম থেকে বের হতে নির্দেশ দেয়নি। এরপর ডাক্তার আমাকে বলেন তিনি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে যাচ্ছেন। এবং তখন উপস্থিত সবাই রুম থেকে বেরিয়ে যায়। প্রায় ১০ মিনিট পর কাশেম একা ফিরে আসেন। জিজ্ঞেস করেন, ডাক্তার জানতে চেয়েছেন তার আগে ফোঁড়া ছিল কিনা। আমি উত্তর দিলাম হ্যাঁ। তখন তিনি সেটা ঠিক কোথায় সেটা দেখাতে বললেন। মেয়েকে আবার তখন কাপড় খুলতে হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর তিনি মলম নিয়ে আবার এসে বললেন, ক্ষতস্থানে সেটা লাগাতে হবে। এজন্য আবারো তার শার্ট খুলতে হয়েছিল।
মামলার বাদী বলেন, রাত আনুমানিক ৩টার সময় আমরা ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার মেয়ে তার পোশাক পরিবর্তন করে শুধুমাত্র টিশার্ট পরা ছিল। কিছুক্ষণ পর কাশেম আবার এলকোহল প্যাড নিয়ে আসেন। এবং বলেন, তার চিকিৎসা করতে হবে। আমরা সেই মুহূর্তে অনুমান করতে পারিনি যে তিনি আসলে একজন চিকিৎসাকর্মী নন। এরপর রাত সাড়ে ৩টার দিকে তিনি আবার মশার স্প্রে নিয়ে আসেন। তিনি আমাদের পানি লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করেন। তাকে আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল। কারণ মেডিকেল স্টাফরা এই জাতীয় কাজ করে না। আমি তাকে চলে যেতে বললাম। আমরা তার ক্রমাগত উপস্থিতিতে অত্যন্ত ক্লান্ত এবং বিরক্ত ছিলাম। সকাল সাড়ে ৬টায় কাশেম আমাদের ঘুম থেকে তুলে বললেন যে আমাদের ফোঁড়ার চিকিৎসা করা দরকার। তার হাতে শুধু অ্যালকোহল প্যাড ছিল। গুগল ট্রান্সলেট ব্যবহার করে তিনি আমাকে বারান্দায় যেতে বলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি থাকলে তার চিকিৎসা কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। তাকে অদ্ভুত ও নার্ভাস লাগছিল। তখন আমি সবকিছু বুঝতে পেরে যাই। আমি জোরে জোরে বললাম তাকে বের হয়ে যেতে। এখানে যাতে সে না আসে। আমি তাকে জোরে চিৎকার করে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে চাইলে তিনি আমার হাত ধরতে শুরু করেন। এ সময় দুঃখিত এবং ‘না, না, না’ বলে চিৎকার করেন। তিনি আমার হাত এত জোরে চেপে ধরলেন যে এটি একটি ক্ষত রেখে গেছে। আমি তাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে জোরে জোরে ইংরেজিতে বলেছিলাম আর কখনো এখানে আসবেন না। আওয়াজে কাউন্টারের পেছন থেকে দু’জন নার্স বেরিয়ে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন আমি রুমে গিয়ে দরজা ঠেলে দিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম কাশেম কি তাকে স্পর্শ করেছে? সে বলেছিল সে তার সংবেদনশীল স্থান স্পর্শ করেছে। সে লজ্জিত এবং বিব্রত ছিল।

মামলায় বাদী উল্লেখ করেন ওই ঘটনা জানার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে ক্ষমা চায়। এবং জানানো হয় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা হয় চিকিৎসা উপদেষ্টার পরামর্শে পরে ওই হাসপাতাল থেকে ভুক্তভোগী কিশোরীকে রাজধানীর অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়।
ঘটনার দিন কি ঘটেছিল তার বর্ণনা দিয়ে সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. শাহদাত হোসেন বলেন, নারীদের কেবিন বা ওয়ার্ডে বড় স্যার ব্যতীত আমরাও কোনো সার্জারি কিংবা অপারেশন করি না। এ ছাড়া নারীদের কেবিন কক্ষে আমাদের সঙ্গে সব সময় একজন নারী চিকিৎসক কিংবা নার্স উপস্থিত থাকেন। একজন পুরুষ ওয়ার্ডবয় কখনোই কেবিনে প্রবেশের সুযোগ রাখে না। ওয়ার্ডবয় কাশেমকে আমি ওভাবে ঠিক চিনি না। ওর সঙ্গে খুব কম শিফটিং ডিউটি করা হয়েছে। গত দু’মাস আগে তিনি রাজধানীর ধানম-ির ইবনেসিনা হাসপাতাল থেকে কল্যাণপুরে বদলি হয়ে আসেন। ঘটনার দিন আরও একাধিক রাশিয়ান নাগরিক কেবিনে চিকিৎসারত ছিলেন। সেদিন কাজের খুব চাপ ছিল। ওয়ার্ডবয় কাশেম কীভাবে এবং কখন ভেতরে প্রবেশ করেছেন সেটা টের পাইনি। পরে রুশ কিশোরীর মা সকালে বিষয়টি আমাকে জানালে আমি কাশেম কোথায় বলে চিৎকার করে ডাকতে থাকি। এ সময় দায়িত্বরত নার্সরা জানায় সে হাসপাতালে নেই। পালিয়েছে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানালে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এডমিন ইনচার্জ নূরে আলম সবুজ বলেন, আবুল কাশেম খুব অল্পদিন হলো বদলি হয়ে এসেছে। একজন ওয়ার্ডবয় বিদেশি এক নাগরিকের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটনানোর ফলে প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সুনাম নষ্ট হবে। ঘটনার পরপরই আমরা হাসপাতালের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। আবুল কাশেমকে আমরা ঘটনার পরপরই স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেই। বিষয়টি যেহেতু তদান্তাধীন তাই এর বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *