কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে তুমুল জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। স্থানীয়দের বলছেন, ‘সালাহউদ্দিন হাঁটলে মিছিল, বসলে জনসভা’। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি পথসভা ও প্রচারণায় এ কথার প্রতিফলন দেখা গেছে। নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর আগেররাতে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, সালাহউদ্দিন তার বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। এ সময় তার বেশকিছু সমর্থক তাদের দুজনের স্মৃতিকথা শুনছেন। দৃশ্য দেখে মনে হবে যেন ছোট একটা জনসভা।

জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত কক্সবাজার-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৪০ হাজার ৮৯০ জন। পোস্টাল ব্যালটসহ ১৭৮টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ পেয়েছেন ২ লাখ ২২ হাজার ১৯ ভোট।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল্লাহ আল ফারুখ (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী) পেয়েছেন ১ লাখ ২৯ হাজার ৭২৮ ভোট। ৯২ হাজার ২৯১ ভোটের বড় ব্যবধানে বিজয়ী হন সালাহউদ্দিন। এ আসনে ভোটদানের হার ছিল ৬৭.০৬ শতাংশ। 

স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী, সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সালাহউদ্দিন আহমদের এ জয়ের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে তার উন্নয়ন ও ক্লিন ইমেজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে আসেন। পরে সেখান থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে ওঠেন।

রাজনীতির পাশাপাশি পড়ালেখা শেষ করে তিনি বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার গঠন করলে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন।

পরবর্তীতে সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে তৃতীয়বার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। সেই সময় চকরিয়া ও পেকুয়ায় অসংখ্য সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও পুল নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষা ও ধর্মীয় অবকাঠামো—স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলা হয় তার উদ্যোগে।

২০০৭ সালের পর দীর্ঘ সময় দল ক্ষমতার বাইরে থাকায় বড় প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে গেলেও পূর্ববর্তী উন্নয়নের সুফল ভোগ করেছেন দুই উপজেলার বাসিন্দারা—এমনটাই মনে করেন স্থানীয়রা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগ আমলে গুম হয়ে দীর্ঘ সাড়ে ৯ বছর ভারতে নির্বাসিত থাকা, এক-এগারোর সময়ে কারাবরণ এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা—এসব ঘটনাও তার প্রতি সহানুভূতি বাড়িয়েছে।

ভারত থেকে দেশে ফিরে তিনি চকরিয়া ও পেকুয়ার বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ইউনিট গুলো পুনর্গঠন ও সক্রিয় করেন, যা সাংগঠনিকভাবে বড় শক্তি জুগিয়েছে। এবারের নির্বাচনে এই সাংগঠনিক শক্তি তার জনসমর্থন আদায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা শাফায়েত আজিজ রাজু এ প্রসঙ্গে বলেন, তিনি পূর্বে এ এলাকার জন্য নিবেদিত ছিলেন, যেটা প্রত্যক্ষ করেছে জনগণ। তিনি দেশের জন্য মজলুম হয়েছেন, জনগণের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে মজলুম হয়েছেন সেটাও একটা কারণ। জনগণ তার প্রতি আস্থা রেখেছেন এবং তাকে বিশ্বাস করেন ও ভালোবাসেন। তিনি নির্বাচিত হলে দেশের জন্য কাজ করবেন, এ বিশ্বাসটুকু মনে গাঁথা আছে সেই কারণে তার প্রতি আস্থা রেখেছে। আমি মনে করি, তার বিজয়ের এটাই অন্যতম কারণ।

চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক বলেন, এ অঞ্চলে সালাহউদ্দিন আহমদকে ছোট্ট শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই চেনেন। সবাই তাকে প্রচন্ড রকমের ভালোবাসেন। তিনি হাঁটলে মনে হবে মিছিল, বসলে জনসভা। নির্বাচনি প্রত্যেকটা পথসভা ও উঠান বৈঠকে এ চিত্রই ফুটে উঠেছে।

বিএনপি নেতাকর্মীদের একটি অংশ ধারণা করেছিলেন, তিনি দেড় লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয় পাবেন। ব্যবধান সে পরিমাণ না হলেও বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত ইমেজ ও রাজনৈতিক সহানুভূতির সমন্বয়ই কক্সবাজার-১ আসনে সালাহউদ্দিন আহমদের ভূমিধস জয়ের নেপথ্যের মূল কারণ—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here