মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে টানা ৩৯ দিন ভয়াবহ যুদ্ধের পর দুই সপ্তাহের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়েছে।

 তবে সংঘাত স্থগিত হলেও এর শক্তিশালী প্রভাব এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইরান ও চীন আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগকে সামনে এনেছে- আর তা হচ্ছে মার্কিন ডলারের আধিপত্য গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

 

বিশ্ব বাণিজ্য, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ডলারের প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০২৩ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন ডলারে সম্পন্ন হয়। এই বাস্তবতায় ইরান ও চীন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ দেশগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রাখে।

নতুন এই প্রেক্ষাপটে, গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে নতুন এক অর্থনৈতিক কৌশল সামনে এসেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে ইরান ‘টোল’ ব্যবস্থা চালু করে কিছু বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ফি বা টোল আদায় করছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানা গেছে।

মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত অন্তত দুটি জাহাজ ইউয়ানে এই ফি পরিশোধ করেছে বলে শিপিং সূত্র জানিয়েছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও পরোক্ষভাবে এই তথ্য স্বীকার করেছে। এমনকি ইরানের কূটনৈতিক মহল থেকে ‘পেট্রোইউয়ান’ ধারণাকে বৈশ্বিক তেল বাজারে যুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ ইরান ও চীনের জন্য ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করছে। একদিকে, ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলতে পারছে; অন্যদিকে, পারস্পরিক বাণিজ্যে খরচ কমানো ও সহজীকরণ সম্ভব হচ্ছে। ২০২১ সালে সই হওয়া ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তির ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে।

চীন বর্তমানে ইরানের জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা, প্রায় ৮০ শতাংশ তেলই তারা কিনে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে ইউয়ানে লেনদেনের মাধ্যমে। এর বিপরীতে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য ও শিল্প উপকরণ আমদানি করে তেহরান।

তবে ইউয়ান এখনও ডলারের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেনি। এর প্রধান কারণ, চীনের কঠোর মূলধন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা-যার ফলে ইউয়ান অবাধে বিনিময়যোগ্য নয়। পাশাপাশি, চীনের আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কিছু সংশয় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অংশ এখনও প্রায় ৫৭ শতাংশ, যেখানে চীনের ইউয়ানের অংশ মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ইউয়ানে নিষ্পত্তি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ ঘটাবে না, তবে এটি ধীরে ধীরে ডলারের প্রভাব কমানোর একটি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। বিশেষ করে যদি উপসাগরীয় দেশগুলো ভবিষ্যতে ইউয়ান গ্রহণ করে, তাহলে এই পরিবর্তন আরও গতি পেতে পারে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীতে ইউয়ানের ব্যবহার এখনও সীমিত হলেও এটি একটি প্রতীকী ও কৌশলগত পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here