হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে। শুরুতে সামরিকভাবে এগিয়ে থাকলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন কৌশলগত চাপের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। বিশেষ করে হরমুজ সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেওয়ায় যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের হাতেই ছিল, এ নিয়ে খুব কম মানুষেরই সন্দেহ রয়েছে। তবে এখন সেই নিশ্চয়তা আর আগের মতো নেই বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী রবিবার বলেন, “যুদ্ধের শেষ আমাদের হাতেই”। তিনি একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ওয়াশিংটনের সেনা প্রত্যাহার এবং হামলায় সৃষ্ট সব ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য শোনা যাবে— এটা অনেকের কাছেই অসম্ভব মনে হতো।
মূলত এই সংঘাত শুরু হয় ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান দ্রুতই প্রমাণ করে যে, তারা ইরানের আকাশসীমায় বাধাহীনভাবে অভিযান চালাতে পারে। ব্যাপক গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মধ্যে ছিল মূলত নিজেদের পক্ষের ভুলে হওয়া ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের দিকে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তবে এর বেশিরভাগই ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত হয়। রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইরানের হামলায় ইসরায়েলে ১৫ জন নিহত হয়েছে। গত বছরের দুই দেশের তুলনামূলক স্বল্পস্থায়ী সংঘাতের তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম।
ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া উপসাগরীয় দেশগুলো ততটা সফল ছিল না। তবে তারা এখনও তাদের নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে মারাত্মক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে। যদিও তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাবে কি না তা নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে শান্তি, বিলাসিতা ও সম্পদের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা এই দেশগুলোর ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রতিদিনই ইরানের ওপর নতুন হামলা চালিয়ে তাদের প্রচলিত সামরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে যাচ্ছে। তবে অনেকের মতে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তাদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সময়সীমার কথা বলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার পরই যুদ্ধ শেষ হতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যা তারা প্রথমে চায়নি।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা লেগেছে, তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং জ্বালানির দামও বেড়েছে। ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য ট্রাম্প এখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছেন।
তবে জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি অরবাখ মনে করেন, যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি এখনও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রই নির্ধারণ করছে। তিনি বলেন, উদ্যোগ থাকা মানে হলো এজেন্ডা নির্ধারণ করা। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা দ্রুত কমে আসছে। তাই তেহরানের সামনে একমাত্র পথ ছিল সংঘাত আরও বাড়ানো এবং আশা করা যে এতে কোনওভাবে যুদ্ধ থেমে যাবে। সে কারণেই তারা উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে।
কিছু বিশ্লেষক ধারণা করছেন, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের পথে থাকা মার্কিন মেরিন বাহিনীকে ইরানের প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের নির্দেশ দিতে পারেন, যাতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। তবে এই মেরিন সদস্যরা সেখানে পৌঁছাতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় নেবে।
ট্রাম্প চাইলে খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার নির্দেশও দিতে পারেন, আর এটি ইরানের অর্থনীতিকে বহু বছরের জন্য অচল করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানে শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। শনিবার ট্রাম্প বলেন, ‘মানবিকতার কারণে’ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অরবাখ বলেন, ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করা হবে কি না— তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। যদি অচলাবস্থা তৈরি হয়ও, তা সমান অবস্থানের হবে না।
তবে অন্য কিছু বিশ্লেষক ভিন্ন মত দিয়েছেন। লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার নয়মান বলেন, ইরান খারাপ পরিস্থিতিকেও সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। তার ভাষায়, কয়েক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার জবাব কী হবে—তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে পড়ার বিষয়টি তারা স্পষ্টতই আশা করেনি। আমার মনে হয় এখন ইরানের হাতেই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় যোগ দিতে ট্রাম্প অন্য দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনও দেশ এতে রাজি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এমন উদ্যোগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ শত শত তেলবাহী ট্যাংকারকে নিরাপত্তা দিতে বিপুল সামরিক সম্পদ মোতায়েন করতে হবে, তবুও পুরো নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র, একটি মাইন কিংবা বিস্ফোরকবোঝাই ছোট নৌকাও বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।
এ থেকে বোঝা যায়, শেষ পর্যন্ত প্রণালি পুনরায় খুলবে কি না— সে সিদ্ধান্ত তেহরানেই নিতে হবে। ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে আগ্রহী—এমন কোনও লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে ইরানে সরকার পরিবর্তনের যে আশা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল করেছিল, সেটিও আপাতত খুব কাছাকাছি বলে মনে হচ্ছে না।
পিটার নয়মান বলেন, ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসে বড় সাফল্য এলেও তা কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল দেয়নি। সরকারটি দুর্বল মনে হলেও স্থিতিশীল রয়েছে।
রবিবার ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা লিখেছেন, যুদ্ধের শুরুতে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সরকার এখন তা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছে। ইসরায়েল হায়োম পত্রিকায় ইয়োভ লিমোর লিখেছেন, কর্মকর্তারা এখন মনে করছেন ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সরকারের শক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর দমন-পীড়ন। আর এটি ইরানি জনগণকে আতঙ্কিত করে রেখেছে।
এদিকে এই বিস্তৃত আঞ্চলিক সংকটের ভেতর আরও কিছু ছোট সংঘাত আলাদা গতিপ্রকৃতি নিতে পারে। ইরানপন্থি ইরাকি মিলিশিয়ারা এখনও পুরোপুরি ইরানকে রক্ষায় যুদ্ধে জড়াতে রাজি হয়নি। ইয়েমেনের হুথিরাও এখনও সরাসরি এই সংঘাতে প্রবেশ করেনি।
তবে লেবাননে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলকে অবাক করে দিয়ে খামেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসেবে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এরপর থেকে ইরানসমর্থিত এই সংগঠনটি উত্তর ইসরায়েলে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা অনেক বিশ্লেষকের ধারণার চেয়েও বেশি শক্তির ইঙ্গিত দিয়েছে।
এর জবাবে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এতে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় আট লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। লেবাননভিত্তিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ডেভিড উড বলেন, হিজবুল্লাহর অবস্থান ইরানের মতো শক্ত নয়।
তিনি বলেন, ইসরায়েলের স্পষ্ট লক্ষ্য হলো তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হিজবুল্লাহকে হুমকি হিসেবে সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা। যদিও তারা কীভাবে তা করবে, তা স্পষ্ট নয়। আর হিজবুল্লাহর একমাত্র লক্ষ্য হলো টিকে থাকা।
উড বলেন, সংঘাতের শুরুতে হিজবুল্লাহ হয়তো ইসরায়েলকেও অবাক করে দিয়েছিল। তবে ইসরায়েলের বিপুল সামরিক শক্তির সামনে দীর্ঘমেয়াদে তারা সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারবে— এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান




