মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ক্রমশ গভীরতর হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার পর দেশটির অবশিষ্ট নেতৃত্বের সঙ্গে তিনি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। রোববার ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। এর আগে গত শনিবার ইরানের শাসনব্যবস্থা উৎখাতের উদ্দেশ্যে চালানো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ অভিযানে খামেনি নিহত হয়েছেন।

এদিকে ইরানে হামলা এবং তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সোমবার এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে লেবাননেও। ইসরাইলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করলে তেল আবিব লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও খামেনির উপদেষ্টা আলি লারিজানি সোমবার বলেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে মর্মে যে খবর চাউর হয়েছে তাও অস্বীকার করেন তিনি।

জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি শনিবার জরুরি নিরাপত্তা পরিষদ বৈঠকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত বা আহত হয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, একাধিক শহরে ইচ্ছাকৃতভাবে আবাসিক এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

দ্বিতীয় দিনের গোলাবর্ষণের পর নিহতের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শনিবার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা হামলায় অন্তত ১৬৫ জন নিহত হয়েছেন।

১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিই ইসরাইলি হামলার প্রধান লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএ কয়েক মাস ধরে খামেনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, তেহরানে নিজের কম্পাউন্ডে শীর্ষ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বৈঠক ডাকলে সিআইএ ইসরাইলকে তথ্য দেয় এবং সেখান থেকেই হামলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ইসরাইলের চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, অভিযানের দিন সকালে ইসরাইলি সেনা কর্মকর্তাদের নিয়মিত জায়গায় গাড়ি পার্ক করতে নিষেধ করা হয়। যাতে ইরানের গোয়েন্দারা কোনো প্রস্তুতির ইঙ্গিত না পায়। পাশাপাশি বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো হয় যে, চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির বাসাতেই অবস্থান করছেন। চ্যানেলটির দাবি, হামলার প্রথম ৩০ সেকেন্ডেই ইসরাইলি বিমানবাহিনী ৩০ জন উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তাকে হত্যা করে।

ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, প্রথম দুই দিনে ইরানের ৪৮ জন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি আরও দাবি করেন, ইরানের নয়টি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে এবং নৌ সদরদপ্তর ধ্বংস করা হয়েছে।

এবিসি নিউজের প্রতিবেদক জনাথন কার্ল জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের কয়েকজন প্রার্থী চিহ্নিত করেছিল, কিন্তু তারা প্রাথমিক হামলাতেই নিহত হয়েছেন। কার্লের বরাত দিয়ে ট্রাম্প বলেন, হামলাটি এতটাই সফল ছিল যে সম্ভাব্য অধিকাংশ প্রার্থীই নিহত হয়েছেন। আমরা যাদের কথা ভাবছিলাম, তারা সবাই এখন মৃত।

ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এ পর্যন্ত নয়জন (এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ছিল ১৩) ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে মার্কিন বাহিনী তাদের প্রথম হতাহতের কথা নিশ্চিত করেছে। তিনজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। তবে কোথায় ও কীভাবে তারা হতাহত হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলা চালিয়েছে, যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। কুয়েত, আবুধাবি ও দুবাইয়ের বিমানবন্দর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রোববার বন্ধ ছিল, ফলে বৈশ্বিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে বিমান হামলা আরও জোরদারের অঙ্গীকার করেছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প আটলান্টিক ম্যাগাজিনকে বলেন, তিনি ইরানের অবশিষ্ট ও নবনিযুক্ত নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন। তিনি বলেন, তারা কথা বলতে চায়, আমিও রাজি হয়েছি। আমরা কথা বলব। তাদের আরও আগেই এটা করা উচিত ছিল।

ডেইলি মেইলকে দেয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও চার সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, আরও মার্কিন হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে এবং মার্কিন নাগরিকদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া হবে।

যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালীর আশপাশে দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। প্রায় ১৫০টি ট্যাঙ্কার নোঙর ফেলে অপেক্ষা করছে বলে জানা গেছে। এমএসসি ও মায়ের্স্কসহ বড় কন্টেইনার শিপিং কোম্পানিগুলো এ অঞ্চলে চলাচল স্থগিত করেছে।

জাহাজে হামলার ঘটনা সম্ভাব্য পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি ইরানের জনগণের জন্য ৪৭ বছরের ইসলামি শাসনব্যবস্থা উৎখাতের সুযোগ তৈরি করবে। এ বছরের শুরুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ দমন করতে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অভিযান চালায়, যেখানে কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন অনুমান রয়েছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরাক সীমান্তবর্তী মেহরান এলাকায় ২২ জন সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে সরকারবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করতে চাইছে বলে অভিযোগ তেহরানের।

দেশজুড়ে সাধারণ ইরানিদের মধ্যে আতঙ্ক ও আশার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ দীর্ঘ প্রতীক্ষিত হামলা শুরু হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন, আবার শাসনবিরোধীরা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন। তবে বেসামরিক হতাহতের ফলাফল তাদের আশাকে শঙ্কায় রূপ দিচ্ছে।

আলি লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ইরানকে খণ্ডিত ও লুট করার চেষ্টার অভিযোগ এনে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তেহরান সরকার বলেছে, খামেনির মৃত্যু তাদের মনোবল দুর্বল করবে না। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প লাল রেখা অতিক্রম করেছেন এবং এর মূল্য দিতে হবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্য নিয়ে গঠিত একটি নেতৃত্ব পরিষদ সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করবে। খামেনি কোনো উত্তরসূরি মনোনীত করে যাননি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাঈ এমএস নাও ভেলশি অনুষ্ঠানে বলেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, তবে আমরা যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আরোপিত আগ্রাসী যুদ্ধের মধ্যে আছি, প্রক্রিয়াটি দ্রুততর হবে।

এদিকে আটলান্টিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতি করার ধারণা তিনি মানেন না। তিনি দাবি করেন, আমাদের অর্থনীতি ইতিহাসের সেরা অবস্থায় রয়েছে। তবে রয়টার্স-ইপসস জরিপে দেখা গেছে, মাত্র চার ভাগের এক ভাগ মার্কিন নাগরিক ইরানে হামলার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন। তেলের দামের সম্ভাব্য ঊর্ধ্বগতির প্রভাব এখনও পুরোপুরি অনুভূত না হলেও, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অভিঘাত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here