ইউক্রেন ও গাজা পরিস্থিতির পর এবার মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন করা অত্যন্ত শক্তিশালী ‘টার্মিনাল হাই-অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। 

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলায় সিউলের সেওংজু ঘাঁটিতে অবস্থান করা এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থাটি এখন ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ সুরক্ষায় ব্যবহৃত হবে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সর্বাত্মক যুদ্ধের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ওয়াশিংটন এই কৌশলগত পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ইরান থেকে ছোড়া কয়েকশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাত রুখতে গিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে চলতি মাসের শুরুতে জর্ডানে অবস্থিত একটি থাড ব্যাটারির গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ার খবর আসার পর থেকেই পেন্টাগন তড়িঘড়ি করে এই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্থানান্তর মূলত মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর বাড়তে থাকা চাপের স্পষ্ট প্রতিফলন। ইরান ইতিমধ্যে পাঁচ শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে নিউইয়র্ক টাইমসের এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। যদিও এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বেশিরভাগই আকাশপথে ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে, তবে টানা হামলার মুখে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামগুলো ক্রমে ফুরিয়ে আসছে। এমন অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়াকে সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার খবরে সিউলের রাজনৈতিক মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির মুখে এই থাড ব্যবস্থাটি ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার আকাশসীমার প্রধান রক্ষাকবচ। দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে মার্কিন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর কথা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, ওয়াশিংটনের নেওয়া এই বৈশ্বিক সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর সিউলের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত সীমিত এবং তারা চাইলেও এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি রুখতে পারছে না।

তবে জনমনে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা শঙ্কার জবাবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে আশ্বস্ত করেছে, থাড সিস্টেমের আংশিক স্থানান্তরে তাদের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের ফাটল ধরবে না। সিউল দাবি করেছে, উত্তর কোরিয়ার যেকোনো উস্কানি মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবস্থা এখনো তাদের হাতে রয়েছে। মার্কিন সেনারাও জানিয়েছে, সিউলে তাদের অবশিষ্ট ২৮ হাজার ৫০০ সৈন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হবে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড সরানোর এই বিষয়টি নিয়ে চীন তার দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। ২০১৭ সালে যখন প্রথমবার এই ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছিল, তখন বেইজিং দাবি করেছিল যে থাডের শক্তিশালী রাডার চীনের অভ্যন্তরীণ সামরিক কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করতে সক্ষম। বর্তমানে এই ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে যেকোনো ধরনের থাড মোতায়েনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান এখনো আগের মতোই কঠোর রয়েছে।

লকহিড মার্টিনের তৈরি এই ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের থাড ব্যবস্থাটি মূলত শেষ পর্যায়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আঘাত করে ধ্বংস করার জন্য পরিচিত। এটি কোনো বিস্ফোরক ছাড়াই কেবল গতিশক্তির ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুকে আকাশেই গুঁড়িয়ে দিতে পারে। বর্তমানে সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি থাড ব্যাটারি রয়েছে, যার প্রতিটি পরিচালনার জন্য প্রায় ১০০ জন সেনার প্রয়োজন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রে এখন এই স্বল্পসংখ্যক কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর ব্যবস্থাটির উপযোগিতা যাচাই করা হচ্ছে।

সূত্র: গালফ নিউজ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here