লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বাসায় ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা এবং পরে গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার কারণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা ধরনের আলোচনা থাকলেও এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পুলিশ। রহস্য উদ্ঘাটনে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, এ হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক কোনো বিষয় নয়। এ ঘটনাকে পুঁজি করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে দেওয়া হবে না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।
শুক্রবার নিহত পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য জুনাইদ ইসলাম সিফাত অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে বিকেলে রায়পুরের ধানহাটা এলাকায় প্রথম জানাজা এবং রাতে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে মা ও তিন মেয়ের মরদেহ পাশাপাশি দাফন করা হয়।
অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদারের মৃত্যুর ঘটনায়ও অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে পৃথক মামলা হয়েছে। প্রথমদিকে স্বজনরা মরদেহ নিতে অস্বীকৃতি জানালেও পরে দূর সম্পর্কের এক চাচাতো ভাইয়ের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে পুলিশ।
রায়পুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রাশেদ জানান, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপার ঘটনাটি তদারকি করছেন।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, দিনের বেলায় একজন ব্যক্তির পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আবার সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করার পরও কীভাবে গণপিটুনিতে হত্যা করা হলো, সেটিও আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি নিহত পরিবারের আর্থিক অবস্থা, বাসার দায়িত্ব এবং সম্ভাব্য লুটপাটের বিষয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. অরূপ পাল জানান, নিহত পাঁচজনের মরদেহের ময়নাতদন্তে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
নিহত শাহিনুর বেগমের ছোট ভাই ছানা উল্লাহ দাবি করেন, স্বর্ণালংকার লুটের উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। একই দাবি করেন শাহিনুরের ছেলে জুনাইদ ইসলাম সিফাত। তিনি বলেন, বাড়ির ভাড়া সংগ্রহ এবং কিছু স্বর্ণালংকারের বিষয়টি সন্দেহের কারণ হতে পারে। তবে ঘটনার পেছনে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, একজন মানুষের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধোঁয়াশা রয়েছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা নদীপাড় এলাকায় একটি পাঁচতলা ভবনের নিচতলার বাসায় ঢুকে শাহিনুর বেগম (৩৮), তার মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার শিফাকে (১০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের চিৎকার শুনে স্থানীয় এক নারী বাইরে থেকে ভবনের গেট বন্ধ করে দিলে অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ভেতরে আটকা পড়েন। পরে স্থানীয় লোকজন ভবনে ঢুকে রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। অভিযুক্ত ছাদ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে তাকে ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরে তিনি মারা যান।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর মজুমদার কয়েক মাস আগে একই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। বাসার ভাড়া শাহিনুর বেগমের কাছে জমা দেওয়া হতো এবং তার কাছে কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল বলে জানা যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে লুটপাটের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলতে রাজি নয় পুলিশ।




