বাহ্যিকভাবে চারদিকে আনন্দের জোয়ার। নরসিংদীর স্বনামধন্য নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের ফটকে ঝুলছে শতভাগ জিপিএ-৫ পাওয়ার জাঁকজমকপূর্ণ ব্যানার, বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতেছে কৃতকার্য শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এই কৃত্রিম সাফল্যের আলো ঝলমলে আবরণের ঠিক উল্টো পাশেই রয়েছে এক গভীর অন্ধকার। হাজারো আলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় ভেঙে পড়া দুই শতাধিক শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের নিঃশব্দ কান্না।

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে নবম শ্রেণিতে ৬০১ জন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ ওই ব্যাচের প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশন সংখ্যার তুলনায় ২১৯ জন কম শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, এই ২১৯ জনের সবাই ঝরে পড়েনি। প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন জানান, দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষায় মোট ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ১০১ জন অকৃতকার্য হওয়ায় তারা প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারেনি। বাকি ৩৮২ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এন কে এমে টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী নরসিংদীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে সেখান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে সানবীন স্কুল থেকে ৫০ জন পরীক্ষা দিয়েছে। এদের ২৫ জনই জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ ছাড়া ঘোড়াদিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দেওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজন জিপিএ-৫, নরসিংদী মডেল স্কুল থেকে পরীক্ষা দেওয়া চারজনের মধ্যে একজন জিপিএ-৫ এবং সানশাইন মডেল হাইস্কুল থেকে পরীক্ষা দেওয়া একজন শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পেয়েছে।

অর্থাৎ এন কে এমে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অন্তত ৬০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।  অভিভাবকদের অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে সন্তানদের একটি অংশ এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ হারিয়েছে। এতে তাদের শিক্ষাজীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই ফলকেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। টেস্ট পরীক্ষার দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থী ছাঁটাই করা শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক চরম ব্যর্থতা। আর ব্যবসায়িক সাফল্যের বলি শিক্ষা। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। শুধু ফল ভালো রাখার প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক হতে পারে।

নাছিমা কাদির মোল্লা হাইস্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন বলেন, ‘স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ১০১ জন অকৃতকার্য হয়েছে। তাই ৩৮২ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে পরীক্ষার্থীকে ফরম পূরণ না করতে শিক্ষা বোর্ডের পরিপত্রে বলা হয়েছে। আমরা শিক্ষা বোর্ড ও সরকারের নির্দেশনা মেনেই কাজ করেছি। এখানে কোনো অনিয়ম করা হয়নি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here