ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক মিসাইলের তীব্র সংকটে পড়েছে বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জ্যাক বাকবি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই উচ্চ-তীব্রতার বিমান অভিযানে ইরানের সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কমান্ড সেন্টারগুলো ধ্বংস করতে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। এর ফলে মার্কিন সামরিক ভাণ্ডারে থাকা টমাহকের মজুদ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এটাই এখন ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার এবং সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো গত কয়েক দশকের মধ্যে পেন্টাগনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দূরপাল্লার অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রায় এক হাজার মাইল পাল্লার এই নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্রটি ব্যবহারের প্রধান কারণ হলো এর মাধ্যমে পাইলট বা দামি যুদ্ধবিমানকে বিপদে না ফেলেই ইরানের গভীর অভ্যন্তরে থাকা শত্রুঘাঁটিতে আঘাত হানা সম্ভব। বিশেষ করে যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের রাডার ফাঁকি দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দিতে এই ক্রুজ মিসাইলই ছিল মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রধান ভরসা।
তবে এই বিপুল পরিমাণ ব্যবহারের বিপরীতে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় একটি বড় ধরনের শিল্প ঘাটতি তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রায় ৪ হাজার টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ছিল যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফুরিয়ে আসছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে পেন্টাগন বছরে গড়ে মাত্র ৯০টি করে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে আসছিল। এই মন্থর উৎপাদন হার চলমান যুদ্ধের বিপুল চাহিদার তুলনায় একেবারেই নগণ্য বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
একটি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া যা সাধারণ কোনো কারখানায় সম্ভব নয়। একটি ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন সম্পন্ন হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে কারণ এর ভেতরে থাকা বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সরবরাহ চেইন অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদিও বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরটিএক্স বছরে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে তবুও এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে আরও কয়েক বছর সময় লেগে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিটি টমাহক ব্ল্যাক-ফাইভ ভেরিয়েন্টের ক্ষেপণাস্ত্রের দাম প্রায় ১৩ লক্ষ মার্কিন ডলার যা পেন্টাগনের বাজেটের ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করছে। মার্কিন নৌবাহিনী আশির দশক থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার টমাহক ক্রয় করলেও তার একটি বড় অংশ মহড়া এবং বিগত বিভিন্ন যুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। ইরানের ভূখণ্ড অত্যন্ত বিশাল এবং ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় হওয়ায় সেখানে পদাতিক বাহিনীর চেয়ে এ ধরণের স্ট্যান্ড-অফ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি যা মজুদ খালি হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ওহাইও-ক্লাসের মতো বিশাল সাবমেরিনগুলো একেকবারে ১৫৪টি টমাহক বহন করতে পারে যা মার্কিন নৌবাহিনীর সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু যদি ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ ঠিক না থাকে তবে এই শক্তিশালী নৌযানগুলো সমুদ্রে অনেকটা অকেজো হয়ে পড়বে। বিশ্লেষক বাকবি সতর্ক করেছেন, সরবরাহ ব্যবস্থার এই সংকট ২০ দশকের শেষভাগ পর্যন্ত মার্কিন সামরিক সক্ষমতায় একটি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করতে পারে। এটি কেবল ইরানের সাথেই নয় বরং ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরাশক্তির সাথে দ্বন্দ্বে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো কীভাবে দ্রুততম সময়ে এই ‘ম্যাগাজিন ডেপথ’ বা অস্ত্রের মজুদ বৃদ্ধি করা যায়। কারণ আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল বীরত্বের ওপর নির্ভর করে না বরং এটি শিল্প সক্ষমতা এবং রসদ সরবরাহের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যদি দুই বছরের উৎপাদন চক্র ত্বরান্বিত করা না যায় তবে ইরান অভিযানের পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প এবং সম্ভবত আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে হতে পারে।




