গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাৎক্ষণিকভাবে ইরানও পাল্টা হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় ভয়াবহ হামলা চালায় ইরানি বাহিনী। এতে অগ্নিগর্ভে পরিণত হয় গোটা মধ্যপ্রাচ্য। সেই সঙ্গে বন্ধ করে দেয় বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী। এতে গোটা বিশ্বে জ্বালানি অস্থিরতা দেখা দেয়।

টানা ৩৯ দিন যুদ্ধ শেষে দুই সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। গত ৮ এপ্রিল থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এই সময়ে পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় বসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেই আলোচনা ব্যর্থ হয়।

সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে এক রকম একক সিদ্ধান্তেই অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে আবারও আলোচনায় বসার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ইরান দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি।

ইরান যুদ্ধের এই পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’। 

পত্রিকাটির অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর প্রবীণ ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন টিসডাল প্রতিবেদনে লিখেছেন, সাম্প্রতিক এই যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে কোনও পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না- এ বিষয়ে একমত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলা, কঠোর ভাষা এবং নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা তেহরানকে ভবিষ্যৎ আত্মরক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার যৌক্তিকতা দেখাতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ইরানের কাছে এখনও পারমাণবিক অস্ত্র নেই, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালের পর থেকে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। তবে সাম্প্রতিক হামলা ও ‘ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়ার’ মতো হুমকি দেশটির নীতিনির্ধারকদের অবস্থান বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কট্টরপন্থী অংশ মনে করে-পারমাণবিক অস্ত্রই ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধের একমাত্র নিশ্চয়তা।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলা-তা চলমান কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই হোক বা বাইরে-ইরানের কাছে শান্তিচুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে তেহরান বিকল্প পথ খুঁজতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সামরিক হামলা চালিয়ে কোনও দেশের পারমাণবিক জ্ঞান বা সক্ষমতা ধ্বংস করা যায় না। প্রয়োজন হলে ইরান নিজ দেশে না বানিয়ে বিদেশ থেকেও প্রযুক্তি বা উপকরণ সংগ্রহ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়া একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দীর্ঘদিন ধরেই পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন ও বিস্তারে সক্রিয়। অতীতে সিরিয়া ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতার নজির রয়েছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রয়োজন হলে তেহরানকে সহায়তা দিতে পারে পিয়ংইয়ং।

অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও ইরানের পারমাণবিক সহযোগিতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক পারমাণবিক বিস্তার রোধ ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। ১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর অস্ত্র কমানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তারা বরং আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ চালিয়ে যাচ্ছে।

এর ফলে, ইরানের মতো দেশগুলো পারমাণবিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি অনুভব করছে। ইতোমধ্যে ইউক্রেন, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন- পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলে বড় শক্তির হামলার ঝুঁকি বাড়ে।

এ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। যদি ইরান এ পথে এগোয়, তবে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিসরের মতো দেশগুলোও একই পথে হাঁটতে পারে- যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক সমাধানই একমাত্র পথ। অন্যথায় ‘পারমাণবিক ভারসাম্য’ বা পারস্পরিক ধ্বংসের আশঙ্কা- যা স্নায়ু যুদ্ধের সময় দেখা গিয়েছিল- তা আবারও বাস্তবে রূপ নিতে পারে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here