যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা তৃতীয় দিনের সামরিক সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম চার সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও অর্ধেকে নেমে এসেছে।

আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারের প্রধান সূচক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও ২ শতাংশ বেড়েছে। আগের দিনের ৯ দশমিক ৬ শতাংশ উল্লম্ফনের পর সেপ্টেম্বর সরবরাহের ব্রেন্ট ফিউচারের দাম জিএমটি সময় ৩টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ৯১ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। এটি গত ১৫ জুনের পর সর্বোচ্চ দাম।

গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার পর তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, টানা তৃতীয় দিনের অভিযানে ইরানের এমন সামরিক সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক মানুষের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে দুটি সুপার ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ওয়াশিংটন আবারও ইরানের সমুদ্রবন্দর অবরোধ কার্যকর করবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে ট্রানজিট ফি আদায় শুরু হবে বলেও জানান তিনি।

এ পরিস্থিতিতে তেলের বাজারে আরও অস্থিরতার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থান অব্যাহত থাকলে তেলের দামে আরও বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিতে পারে। তার মতে, সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুদের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার হয়ে যাওয়ায় বাজার আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলেও। জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত মাত্র ৫৭টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় যা ৫০ শতাংশেরও বেশি কম। অথচ ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ এ পথ দিয়ে চলাচল করত।

তেলবাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কমোডিটি কনটেক্সটের প্রতিষ্ঠাতা রোরি জনস্টন বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে। তার মতে, সংকটের শুরুতে বৈশ্বিক তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় বাজার বড় ধাক্কা সামাল দিতে পেরেছিল। কিন্তু সেই অতিরিক্ত মজুদের বড় অংশ এখন শেষ হয়ে গেছে। ফলে সরবরাহে নতুন করে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে আবারও বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র : আল জাজিরা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here